মানুষের যে অঙ্গ শরীর থেকে স্বাভাবিকভাবেই আলাদা করা হয়েছে, যেমন চুল ও নখ তার বেচাকেনা কি বৈধ?
ইসলাম ওয়েব.নেট-এর এক ফতোওয়ায় এ প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, আলহামদু লিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, ওয়া আলা আলিহি ওয়া আস হাবিহি। অতঃপর : মানুষের চুল জীবিত মানুষের হোক বা মৃত মানুষের, শরীরের সাথে থাক বা শরীর হতে আলাদা হোক পাক ও পবিত্র। তবে তা দ্বারা কোনোভাবে উপকৃত হওয়া ও বেচাকেনা করা বৈধ নয়; কারণ তাতে মানুষের মান, মর্যাদা ক্ষুণœ হয়। হানাফি ফিকাহর ‘হেদায়া’র শরাহ ‘ইনায়া’য় আছে, ‘মানুষের চুল বিক্রি করা ও তা দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ নয়। কারণ মানুষ সম্মানিত, নীচ নয়। কাজেই তার শরীরের কোনো অংশ অসম্মানিত ও হীন হতে পারে না।
মালেকি মাজহাবের আদবি, খরাশীর লেখা ‘শারহু মুখতাসারি খালীল’ এর টিকায় বলেন, মানুষের মাথা থেকে যে চুল কর্তন করা হয় তা বেচা যাবে কি না ইমাম মালেককে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি তা বিক্রি করা মাকরুহ বলে মন্তব্য করেন।
ইমাম নববী ‘আল মাজমু’তে বলেন, এটি শাফেয়ি মাজহাবের একটি গ্রন্থÑ যে জিনিস অঙ্গে থাকলে বিক্রি করা যায় না সে জিনিস অঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও বিক্রি করা যায় না। যেমন : মানুষের চুল। বাহওয়াতি ‘কাশ্শাফুল কেনা’য় বলেন, এটি হাম্বলী মাজহাবের একটি গ্রন্থÑ মানুষের চুল পাক পবিত্র বলে হুকুমদান সত্ত্বেও তা ব্যবহার করা বৈধ নয়; কারণ তা সম্মানিত ও মর্যাদাবান।
আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।…
ইসলাম সাওয়াল জাওয়াব.কমে প্রশ্ন করা হয়, কোনো মহিলার জন্য কি তার মাথার চুল এমন কোনো সংস্থায় দান করা বৈধ যে তা দ্বারা যেসব শিশুর মাথার চুল ক্যান্সারের কারণে উঠে গেছে বা পুড়ে গেছে বা টাক পড়েছে, তাদের জন্য পরচুলা বানাবে?
জবাব : আল-হামদুলিল্লাহ।
প্রথমত, এ ব্যাপারে ফকিহদের মধ্যে কোনো মতদ্বৈধতা নেই যে, মানুষের জন্য তার মাথার চুল বিক্রি করা নিষিদ্ধ, কারণ তা তারই শরীরের একটি অংশ। কারণ মানুষ সম্মানিত। আর তার কোনো অঙ্গের বেচাকেনা তাকে অসম্মান ও অবমাননার দিকে ঠেলে দেয়।
আল মাওসূয়া আল ফিকহিয়্যায় (২৬/১০২) আছে : এ ব্যাপারে ফকিহদের মধ্যে ঐকমত্য আছে যে, মানুষের চুল বিক্রি করে বা ব্যবহার করে তা দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ নয়। কারণ মানুষ সম্মানিত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।’ সূরা আল ইসরা : ৭০। সুতরাং মানুষের কোনো অঙ্গ অবমাননা ও অপমানের বস্তু হতে পারে না।’
দ্বিতীয়ত : তবে মানুষের মাথার চুল কাউকে পরচুলা বানানোর জন্য দান করা প্রসঙ্গে বলতে হয় : মানুষের দান করা চুল ব্যবহার করা কখনো বৈধ হতে পারে, আবার কখনো হারাম হবে। বৈধ হবে যখন তা কারো কোনো ত্রুটি সংশোধন করার জন্য ব্যবহার করা হবে। আর হারাম হবে যখন তা ব্যবহার করা হবে রূপচর্চা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য।
শায়খ ছালেহ ইবন মুহাম্মদ আল উসাইমীন বলেন, পরচুলা ব্যবহার দুই ধরনের : প্রথমত সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা। যেমন কোনো মেয়ের মাথায় প্রচুর পরিমাণে চুল আছে যা দ্বারা তার চলে, তার সৌন্দর্যে কোনো সমস্যা হয় না; এমতাবস্থায় তা ব্যবহার করা বৈধ হবে না। কারণ চুল সংযোজন। যা করতে রাসূল সা: নিষেধ করেছেন। ‘যে মহিলা চুল সংযোজন করে আর যার মাথায় চুল সংযোজন করা হয়, রাসূল সা: তাদের ওপর লানত করেছেন’।
দ্বিতীয় অবস্থা হলো : তার মাথায় আদৌ কোনো চুল নেই, যার কারণে তাকে অন্য নারীদের সামনে লজ্জিত হতে হয়, তার পক্ষে তার এ লজ্জা কোনোভাবে ঢাকাও সম্ভব নয়, তা ঢাকা পরচুলা ব্যবহার করা ছাড়া সম্ভব নয়; এ রকম অবস্থায় তার জন্য পরচুলা ব্যবহার করাতে আপত্তির কিছু আছে বলে মনে করি না। কারণ তা রূপচর্চার উদ্দেশ্যে নয়। তা ব্যবহার করা হচ্ছে ত্রুটি ঢাকার জন্য। তার পরও তা ব্যবহার না করাতেই সাবধানতা অবলম্বন করা হয়। সে এমনভাবেই তার মাথা ওড়না দ্বারা ঢেকে রাখবে যাতে তার ত্রুটি দেখা না যায়। আল্লাহই ভালো জানেন।…
‘নূরুন আলাদ্দারব’ অনুষ্ঠানের ফতোওয়ায় তিনি বলেন, পরচুলা ব্যবহার করা হারাম। কারণ তা চুল সংযোজনের পর্যায়ভুক্ত। আর নবী চুল সংযোজনকারী ও যার মাথায় সংযোজন করা হয় উভয়কে লানত করেছেন। তবে কোনো মহিলার মাথায় যদি আদৌ কোনো চুল না থাকে; অথবা তার মাথায় টাক পড়ে, তখন এই ত্রুটি ঢাকার জন্য পরচুলা ব্যবহার করা অপত্তিকর হবে না। কারণ ত্রুটি দূর করা বৈধ। এ কারণেই যে লোকটি এক যুদ্ধে নাক কাটা গিয়েছিল তাকে স্বর্ণের নাক লাগানোর অনুমতি দিয়েছিলেন।…
অতএব যে সংস্থা চুল সাহায্য চাচ্ছে ওই সব মেয়ের জন্য পরচুলা তৈরি করতে যাদের চুল পুড়ে গেছে বা ক্যান্সারের কারণে তাদের মাথায় পড়ে গেছে বা অন্য কোনো কারণে মাথায় টাক পড়েছে সে সংস্থা যদি নির্ভরযোগ্য হয়; তাহলে তাদের চুল দান করা বৈধ হবে। আর দানকারী আল্লাহর কাছে এ জন্য সওয়াবেরও আশা করতে পারেন। আর যদি নির্ভরযোগ্য না হয়; অথবা এমন হয় যারা রূপচর্চার জন্য পরচুলা বানায়; তাহলে তাদেরকে দান করা বৈধ হবে না।
আল্লাহই ভালো জানেন।