সেমিফাইনালের মঞ্চেই ইতিহাস গড়ে ফেলেন জার্মান কোচেরা। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ছিলেন তিন জার্মান কোচ। চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের ইতিহাসে এর আগে কখনো তিন জার্মান কোচকে একসঙ্গে দেখা যায়নি। সেখান থেকে কাটা পড়েন লাইপজিগ কোচ ইউলিয়ান নাগালসমান। রইল বাকি দুই—হ্যান্স ফ্লিক ও টমাস টুখেল। পিএসজি-বায়ার্ন মিউনিখের ইউরোপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়বেন এ দুই জার্মান।
অর্থাৎ এবারের শিরোপা যে জার্মানি কিংবা ফ্রান্স যে দেশের ক্লাবেই যাক, তার কলকাঠি নাড়ার ইতিহাসে লেখা থাকবে এক জার্মান কোচের নাম। তার মানে গতবারের ধারাই বজায় থাকবে। টটেনহামের আর্জেন্টাইন কোচ পচেত্তিনোকে কৌশলের খেলায় হারিয়ে শিরোপা জিতেছিলেন লিভারপুলের জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফবি) কোচিং পাঠশালার অনুশীলন প্রধান এরিক রুটেমুলার কিন্তু বেজায় খুশি, ‘এতেই বোঝা যায় জার্মানিতে কোচদের শেখানোর পদ্ধতিটা দারুণ, যারা শেখায় তারাও দুর্দান্ত। এটা ভালো লক্ষণ।’
বায়ার্ন ও পিএসজির বর্তমান এ দুই কোচকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন রুটেমুলার। ২০০৩ সালে তাঁর কাছ থেকে কোচিং লাইসেন্স নিয়েছেন ফ্লিক। এর তিন বছর পর একই গুরুর আশীর্বাদ পেয়েছেন টুখেল। দুজনকে নিয়ে রুটেমুলারের স্মৃতি, ‘ফ্লিক এসে আক্ষরিক অর্থেই সবকিছু শেখা বলতে যা বোঝায় তাই শিখতে চেয়েছে। টুখেলের উন্নতিতে আমি বিস্মিত। সে ক্রীড়াবিজ্ঞানে পড়ালেখা শেষ করে এখানে এসেছিল। ভেবেছিলাম ক্রীড়া অ্যাসোসিয়েশন কিংবা বয়সভিত্তিক দলে কাজ করবে, পিএসজি কিংবা ডর্টমুন্ডের মতো ক্লাবে ডাক পাবে না। টুখেলের উন্নতিতে তাই আমি ভীষণ খুশি।’
ইউরোপসেরা হওয়ার ক্লাব প্রতিযোগিতায় একের পর এক জার্মান কোচদের উঠে আসার হাঁড়ির খবর জানতে যেতে হবে জার্মান নগরী কোলনে। সংগীতজ্ঞ বিটোফোনের জন্ম এখানে। তবে সেখানে আরও একটি ভবন আছে—হ্যান্স ওয়েজওয়েইলার একাডেমি। জার্মানির ফুটবল কোচ গড়ার আঁতুড়ঘর। দেশটির সেরা কোচিং কোর্স করার পীঠস্থান। এখানে ১১ মাসের কঠোর বিদ্যা-শিক্ষা লাভের পর মেলে কোচিং সার্টিফিকেট। ১৯৪৭ সাল থেকে ওয়েজওয়েইলার একাডেমির এটাই ধারা। আর সেই ধারা থেকেই বেরিয়ে এসেছেন ইয়ুর্গেন ক্লপ, নাগালসমান, ফ্লিক, টুখেল…।
এখানেও ভর্তি হওয়াও চাট্টিখানি কথা নয়। প্রতি বছর মাত্র ২৪জন সুযোগ পান ভর্তি হওয়ার। এখানে কোচিং শিখতে আসা ‘গ্র্যাজুয়েট’রা ১১ মাস হাড়ভাঙা খাটুনির পর পান সম্মানসূচক ‘ফুবল লেহরার’ তকমা—ইংরেজিতে তা ‘ফুটবল শিক্ষক’। ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার পেশাদার কোর্সে একজন কোচকে সাধারণত ২৪০ ঘণ্টার কাজ দেখাতে হয়। এরপর নামের পাশে অভিজাত কোচের তকমা লাগে। কিন্তু হ্যান্স ওয়েজওয়েইলার একাডেমি প্রত্যাশা করে কোচের সনদ পেতে একজন প্রশিক্ষণার্থী ৮০০ ঘণ্টা কাজ করবেন। ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০০ কোচ এখান থেকে পেশাদার সনদ নিয়ে কাজ করছেন নানা জায়গায়। তাই চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে সবাইকে পেছনে ফেলে দুই জার্মান কোচের মুখোমুখি হওয়াটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু না।
বায়ার্ন কোচ ফ্লিকের ওয়েজওয়েইলার একাডেমিতে আসার ঘটনা চমকপ্রদ। সাবেক এ মিডফিল্ডার ১৮ বছর বয়সে তিনি ব্যাংকের শিক্ষানবিশ চাকরির জন্য স্টুটগার্টের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। চোটের কারণে মাত্র ২৭ বছর বয়সে বুট তুলে রেখে স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলার সরঞ্জামের দোকান খুলেছিলেন ফ্লিক। পেশাদার কোচিংয়ে নামার কয়েক বছর পর ওয়েজওয়েইলার একাডেমিতে ঢুকে পড়েন ফ্লিক। এরপর ধীরে ধীরে সিঁড়িটা পেয়ে যান তিনি। জার্মানি দলে জোয়াকিম লো-র সহকারী থেকে বায়ার্ন মিউনিখেও একই পদে। সেখান থেকে গত বছর পেলেন প্রধান কোচের দায়িত্ব। এখন তিনি ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে। ফ্লিক, টুখেল, নাগালসমানদের নিয়ে জার্মানির সাবেক স্ট্রাইকার ও বর্তমানের জাতীয় দলের পরিচালক অলিভার বিয়েরহফ তাই ভীষণ গর্বিত, ‘জার্মান ফুটবলের এটি দারুণ সাফল্যের খবর।’
চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে সর্বশেষ দুই জার্মান কোচ মুখোমুখি হয়েছিল ২০১৩ সালে। ক্লপের বরুসিয়া ডর্টমুন্ডকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ইয়ুপ হেইঙ্কেসের বায়ার্ন। গত বছর চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ইউরোপা লিগের ফাইনাল খেলেছে ইংলিশ ক্লাবগুলো। কিন্তু একটি দলের কোচও ইংরেজি ছিলেন না। ১৯৯২ সালে ইউরোপিয়ান কাপ চ্যাম্পিয়নস লিগ সংস্করণে আসার পর থেকে কোনো ইংরেজ কোচ এই টুর্নামেন্ট কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগও জিততে পারেননি।
এদিকে জার্মানি কোচিং নীতিতে পরিবর্তন এনেছে ২০০০ ইউরোয় গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর। খেলোয়াড় গড়তে দেশের আনাচে কানাচে একাডেমি বানানোর পাশাপাশি কোচও গড়ে তুলেছে তারা। এই ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছেন ফ্লিক, টুখেলরা। তাঁদের পরিশ্রমটা হয়তো ৮০০ ঘণ্টার কিন্তু ইউরোপের বাকি দেশগুলো কিন্তু এখান থেকে শিখতে পারে। আজ রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা যখন জার্মান কোচ উঁচিয়ে ধরবেন তখন এ কথাটা নিশ্চয়ই আরও বেশি করে তাঁদের কানে বাজবে।