ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন তৃণমূল জিতলে না পারলে বহিরাগতরা এ রাজ্যের সবকিছু লুট করে নিয়ে যাবে। এদিন কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির কড়া সমালোচনা করে এ রাজ্যের উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন তিনি।
সোমবার বাঁকুড়ার কোতলপুর ও ইন্দাসের বড়জোড়ায় নির্বাচনী সভা এসব কথা বলেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, গতবার নির্বাচনের পর এ রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল বিজেপি। এবার ভোটের সময় ফের এসেছে। এবার এদের ১ এপ্রিল ‘এপ্রিল ফুল’ করে দিন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা এবার জয়ী হলে পাঁচ লাখ বেকারের চাকরি দেব। আমরা দারিদ্র্য অনেক কমিয়ে দিয়েছি। এ কাজ অব্যাহত রাখতে আপনাদের দোয়া-আশীর্বাদ সব প্রয়োজন। বিজেপির কড়া সমালোচনা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এই বিজেপি সোনার বাংলা গড়বে না। দেশটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এখন নিজের নামে স্টেডিয়াম করছেন। কোনো দিন দেশের নামও বদলে দেবে ওরা।
এরপর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও আরও শিক্ষক নিয়োগসহ একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এটা দিল্লির নির্বাচন নয়; এটা বাংলার নির্বাচন। বাংলার কৃষকের ভবিষ্যতের লড়াই। বাংলার শিল্পের ভবিষ্যতের লড়াই।
এদিকে, এ নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা হতেই বিজেপির গৃহবিবাহ সামনে এসেছে। জেলায় জেলায় প্রার্থী নিয়ে চলছে বিক্ষোভ-ভাঙচুর। কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে এরই মধ্যে অন্তত এক জায়গায় প্রার্থী বদল করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজ্যজুড়ে লাগাতার বিক্ষোভ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
গত রোববার পশ্চিমবঙ্গ সফরে গিয়ে অমিত সাফ জানিয়ে দেন, প্রার্থী নিয়ে কোনো বিক্ষোভ বরদাশত করবে না দল। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলে গৃহবিবাদ তৈরি না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে হটাতে দলীয় নেতাকর্মীদের একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
এদিন বিকেলে পূর্ব মেদিনীপুরের মেছেদায় দলীয় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন শাহ। এ সময় নেতাকর্মীদের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন তিনি।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর খোদ কলকাতায় বিজেপির হেস্টিংস কার্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিজেপির নেতাকর্মীরা দলীয় অফিস ঘেরাও করে রাখেন। এরপর প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হতেই মালদা, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, জগদ্দল, দুর্গাপুর ও দমদমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন দলীয় নেতাকর্মীরা। কোথাও দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর, কোথাও সড়ক অবরোধ, রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বিক্ষুব্ধরা। প্রার্থী তালিকায় পছন্দের প্রার্থী না পেয়ে অনেকে দলও ছেড়ে গেছেন। কোচবিহার বিজেপির সহসভাপতি ভবেশ রায় প্রার্থী অসন্তোষের জেরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন।
বিক্ষোভের নেপথ্যে মূলত দুটি কারণ উঠে আসছে। বহিরাগত বনাম ভূমিপুত্র এবং আদি ও নব্য বিজেপির লড়াই। বিক্ষুব্ধ বিজেপির নেতাকর্মীদের বক্তব্য, স্থানীয় পর্যায়ে যারা তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই করে রাজনীতি করেছেন, তাদের প্রার্থী করা হয়নি। বহিরাগত ইস্যুতেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও দমদম কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ বলেন, ‘কলেবরে বিজেপি বাড়ছে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ দল হিসেবে মনোনয়নের সময় এ রকম হতেই পারে। আর যারা বিজেপির উত্থানে শঙ্কিত, তারা উদ্দেশ্য নিয়ে বিক্ষোভগুলো করাচ্ছে।’
দ্বিতীয়ত, যারা সদ্য তৃণমূল ও অন্য দল থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, তাদের কেন প্রার্থী করা হয়েছে- এ প্রশ্ন তুলে বিক্ষোভ করছেন কর্মীরা। সিঙ্গুর আন্দোলনের অন্যতম মুখ রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেখানকার বিজেপির কর্মীরা। জিতেন্দ্র তিওয়ারির বিরুদ্ধে পান্ডবেশ্বরে বিক্ষোভ হয়েছে। শান্তিপুরের তৃণমূল বিধায়ক অরিন্দম ভট্টাচার্যকে জগদ্দলের প্রার্থী করায় রীতিমতো রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বিজেপির কর্মীরা।
নির্বাচনের মুখে কর্মীদের দলীয় অফিস ভাঙচুর বা পথ অবরোধ বিজেপির নির্বাচনের ফলে কী আঘাত হানতে পারে? অধ্যাপক অমল মুখোপাধ্যায় মনে করেন না যে, এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভ মিটে গেলেই মানুষ এসব ভুলে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে প্রতীক দেখে ভোট হয়। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এ ব্যাপারে একটু সচেতন হওয়া দরকার ছিল।’