দক্ষ কর্মকর্তার সংকটে মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার) মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করা যাচ্ছে না। এতে অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করতে বিলম্ব হচ্ছে। আর তদন্ত নিষ্পত্তি বিলম্বের কারণে অপরাধ না নিরপরাধ, তা প্রমাণের আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যবসায় পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য। এছাড়া আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের (প্রকৃত দামের চেয়ে কম দেখানো) মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সমন্বয় বৈঠকে উঠে এসেছে এসব তথ্য। বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, মানি লন্ডারিং মামলাগুলোর তদন্ত সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান মামলাগুলো যাতে হেরে না যায়, সেজন্য প্রমাণযোগ্য তথ্যসহ আদালতে চার্জশিট দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, মানি লন্ডারিং বিষয়ে অসংখ্য মামলা দীর্ঘদিন তদন্তাধীন আছে। এসব মামলার চার্জশিট দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া দক্ষতার অভাবে তদন্ত কর্মকর্তারা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এজন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের এ বিষয়ে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে বলেন তিনি। বিশেষ করে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-সহ পাঁচটি সংস্থা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায়। অন্য চারটি সংস্থা হলো-পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এর আগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলা তদন্তের দায়িত্ব ছিল শুধু দুদকের।
এনবিআর মানি লন্ডারিং মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর আলোচিত অনেক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আপন জুয়েলার্সের ৫টি শোরুম থেকে ১৫ মণ ১৩ কেজি স্বর্ণ, ৭ হাজার ৩৬৯ পিস ডায়মন্ডখচিত অলংকার, ৬৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ১০০ মার্কিন ডলার জব্দের ঘটনা। এসব ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়। অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলাগুলো করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
এছাড়া ৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার এলসি (ঋণপত্র) খুলে ১ হাজার ৪০ কোটি টাকার অবৈধ পণ্য আমদানির অপরাধে মেসার্স হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এলসি ও অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি নামের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ ঘটনাটি জালিয়াতির মাধ্যমে সবচেয়ে বড় শুল্ক ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করেছে শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর। আরও আছে ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচারের দায়ে ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ এবং রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তিনটি মামলা করে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং অপরাধে এ পর্যন্ত মোট ৯০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত চলমান আছে ৫৭টি। এর বাইরে ৫টি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আরও ৫টি মামলার চার্জশিট দাখিলের কার্যক্রম চলছে।
এছাড়া অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি মামলা যৌথভাবে তদন্ত করছে সিআইডি, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আরও একটির তদন্ত কার্যক্রম যৌথভাবে চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, কাস্টমস গোয়েন্দা ও অধিদপ্তর। পাশাপাশি ২১টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে সিআইডি ও দুদকের হাতে।
সূত্র জানায়, এরই মধ্যে মানি লন্ডারিং অনুসন্ধান শেষে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলা করার অনুমতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে চাওয়া হয়েছে। আর বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের ১৭টি ঘটনা মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চলছে। নতুন করে আরও তিনটি পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কাছে। তবে এ সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে চলতি মাসের মধ্যে চার্জশিট দাখিলের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, শুধু হিসাব-নিকাশের গরমিল পেলেই এনবিআর মুদ্রা পাচার বা মানি লন্ডারিং মামলা ঠুকে দিচ্ছে। কিন্তু এই মামলা পরে মানি লন্ডারিং হিসাবে প্রমাণ করা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে মানি লন্ডারিং মামলা করার সময় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়ার জন্য এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।