পৃথিবীতে ব্যাপক চর্চিত একটি শব্দ আমানত। আমানত রক্ষা করে চলবে, যথাযথ ব্যক্তির কাছে আমানত পৌঁছে দেবে, তার মধ্যে আমানতদারিতা আছেÑ আমানত শব্দকেন্দ্রিক এ ধরনের অসংখ্য বাক্যমালা সবাই আমরা বলি। কিন্তু বাস্তবে আমরা এর ওপর কতটুকু আমল করি! অথচ আমানত বা বিশ^স্ততা মুসলিমদের প্রধান গুণ। বিশেষ করে দায়িত্বশীলদের প্রথম যোগ্যতাই হচ্ছে আমানতদারিতা। আমানত নেতৃত্ব ও দায়িত্বের একটি অপরিহার্য বিষয়। মানে প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি, সম্পদ ও যাবতীয় দায়িত্বের প্রতি বিশ^স্ততার স্বাক্ষর দেয়া। মূসা আ: যখন মাদয়ানে যান, শুয়াইব আ:-এর এক কন্যা তাঁর বাবার কাছে প্রস্তাব রাখেন যেন মূসা আ:কে কাজে রাখা হয়, কারণ তিনি শক্তিশালী এবং আমানতদার। (সূরা কাসাস : ২৬) দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম সমাজের পদে পদে আমানতদারিতা আজ ভূলুণ্ঠিত প্রায়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের একাধিক স্থানে আমানত রক্ষায় সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতসমূহ তার হকদারকে আদায় করার নির্দেশ করছেন। (সূরা নিসা: ৫৮) লক্ষণীয় যে, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আমানতের একবচন ব্যবহার করেননি; এর বহু ক্ষেত্র বোঝাতে বহুবচনরূপে শব্দটিকে ব্যক্ত করেছেন। আমানতের নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্র নেই। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: আমাদের যে বিধান দিয়েছেন, তা আমাদের কাছে আমানত। এগুলো পালনের মাধ্যমে আমানতের যথাযথ রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। কর্তব্য আমাদের ভেতরকার আমানতগুলো রক্ষা করাও। রাষ্ট্রের কর্ণধারদের কাছে রাষ্ট্রের সম্পদ এবং নাগরিকরা আমানত। গৃহিণীর কাছে ঘরের আসবাবপত্র স্বামীর পক্ষ থেকে আমানত। স্ত্রীর গোপনীয়তা স্বামীর কাছে আমানত। শিক্ষকের কাছে ছাত্র, বাবা-মার কাছে সন্তান, ইমামের কাছে মুসল্লি এভাবে করে আমাদের প্রত্যেকের কাছেই কোনো না কোনো আমানত গচ্ছিত আছে। এগুলোও আল্লাহর নির্দেশের আওতাভুক্ত। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর সাথে বিশ^াসঘাতকতা করো না এবং জেনেশুনে নিজেদের আমানতের খেয়ানত করো না।’ (সূরা আনফাল : ২৭) আমানত হচ্ছে সফলতার সোপান। সূরা মু’মিনুনে সফল মুমিন ও জান্নাতুল ফিরদাউসের অধিকারীদের গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’ (সূরা মুমিনুন : ০৮)
আমানত নবী রাসূলদের গুণ। সূরা শুআ’রায় হজরত নূহ লুত হুদ ও সালিহ আ:-এর আলোচনায় আমরা দেখতে পাই, তাদের প্রত্যেকেই স্বজাতিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য এক বিশ^স্ত রাসূল।’ নবীদের মধ্যে থাকে সব ভালো গুণের সমাহার। কিন্তু এর পরও সব গুণের মধ্যে তাঁরা ‘আমিন’ বা বিশ^স্ত গুণটিকেই হাইলাইট করেছেন। বোঝা যায়, এ গুণটির বেশ তাৎপর্য রয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী সা:-ও ‘আল আমিন’ বা বিশ^াসী উপাধি লাভ করেছিলেন। সততা, আমানতদারিতা এবং অঙ্গীকার পূরণ দেখে তাঁর শত্রুরাই তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
আমানত ঈমানের আলামত। এর মাধ্যমে মুনাফিকি চরিত্র থেকে অব্যাহতি লাভ করা যায়। নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি। এক. কথা বললে মিথ্যা বলে। দুই. ওয়াদা করলে খেলাফ করে। তিন. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে।’ (বুখারি : ২৬৮২) সহিহ ইবনে হিব্বানে আছে, হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সা: বলেন, ‘যার আমানতের ঠিক নেই সে পূর্ণাঙ্গ মুমিন নয়।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৯৪)
এ ছাড়া খেয়ানত মহান আল্লাহর কাছে অপ্রিয় হওয়ার কারণ। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ খেয়ানতকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আনফাল : ৫৮) খেয়ানতকারীর সঙ্গেও খেয়ানত করা যাবে না। নবীজী সা: বলেন, ‘যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে তার আমানত তুমি আদায় করে দাও। যে তোমার সাথে খেয়ানত করেছে তুমি তার সাথে খেয়ানত করো না।’ (তিরমিজি : ১২৬৪) খেয়ানত তো করব না খেয়ানতের পথও তৈরি করে দেবো না। এক বেদুঈন নবীজী সা:-এর কাছে প্রশ্ন করল, কেয়ামত কবে? নবীজী সা: বললেন, ‘যখন আমানত ভূলুণ্ঠিত হবে তখন তুমি কেয়ামতের অপেক্ষা করো।’ বেদুঈন বলল, কিভাবে তা ভূলুণ্ঠিত হবে? নবীজী সা: জবাব দিলেন, ‘যখন কোনো অযোগ্য লোকের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়া হবে তখন তুমি কেয়ামতের অপেক্ষা করো।’ (বুখারি : ৫৯) আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবক্ষেত্রে আমানতদারিতা বজায় রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন!