রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন

দেশে দেশে ভ্যাকসিন যুদ্ধ

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০
  • ৪৭ জন নিউজটি পড়েছেন

করোনাভাইরাসের টিকা হাতে পেতে রীতিমতো হা-পিত্যেশ করছে বিশ্ব। কেবল নিজের শরীরটাকে নিরোগ রাখা নয়, অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে তুলে ফের তাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেয়ার জন্যও যে তা জরুরি। তবে এই লড়াইয়ে এগিয়ে আছে কেবল গুটিকয়েক ধনী দেশ; যেমন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, ইতালি ও জাপান। এছাড়া আছে চীন এবং রাশিয়ার মতো দেশ যারা নিজেরাই ইতোমধ্যেই উৎপাদন করেছে কিংবা করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব দেশের প্রায় কারো ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নেই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল কিংবা ততোধিক অনুন্নত দেশগুলোর কথা।

বিশ্বে বর্তমানে ১৭০টির বেশি গবেষকদল মগ্ন রয়েছে করোনাটিকা উৎপাদনের মিশনে। এর মধ্যে প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালপর্বে রয়েছে ১৩৯টি টিকা। এই পর্বে টিকাটি প্রয়োগ করা হয় প্রাণীদেহে; সেটি প্রাণীদেহের অ্যান্টিবডি বাড়াতে সক্ষম কিনা তা দেখার জন্য। পরবর্তীতে, স্বল্প সংখ্যক মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের প্রথম পর্বে আছে ২৫টি টিকা। এ পর্বে দেখা হয় টিকাটি নিরাপদ কিনা সে বিষয়টি। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে ১৫টি টিকা, যেখানে শত শত মানবদেহে এটি প্রয়োগ করা হয় এর নিরাপত্তা ও সঠিক ডোজ নির্ণয়ের জন্য। তৃতীয় পর্বে রয়েছে ৭টি টিকা। এ পর্বে হাজার হাজার মানবদেহে এটি প্রয়োগ করা হয় এর নিরাপত্তা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানার জন্য। তবে করোনাভাইরাসের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বৈশ্বিক অনুমোদন পায়নি এদের মধ্যে একটিও। গবেষকদের মতে, এসব টিকা সর্বসাধারণের জন্য বাজারে আসতে সময় নেবে এক থেকে দেড় বছর।

তবে টিকা উদ্ভাবন এবং তা বাজারে আসার বহু আগে থেকেই কোটি কোটি টিকা পাওয়ার জন্য কোটি কোটি ইউরো-ডলার ‘টিকাচাষীদের’ কাছে ‘দাদন’ দিয়ে রেখেছে ধনী দেশগুলি। টিকা পাচ্ছেন কি পাচ্ছেন না তার ওপর নির্ভর করছে ভূ-রাজনৈতিক বন্ধুত্ব, রাজনৈতিক অবস্থানের স্থিতিশীলতা এবং মর্যাদা। ইতোমধ্যে টিকা-জাতীয়তাবাদ বলে একটি নতুন ধারণা চালু হয়েছে বিশ্বে। এই জাতীয়তাবাদের অনুসারী দেশগুলো নিজেরাই সরাসরি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ‘দাদন’ দিয়ে আগেই চুক্তি করে রেখেছে ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো বৃহদায়তন টিকা উৎপাদকদের সঙ্গে।

বিশ্বে প্রথম করোনাটিকা উদ্ভাবনের দাবিদার রাশিয়ার টিকা কেনার লাইনে ইতোমধ্যেই দাঁড়িয়ে গেছে ২৭টি দেশ। এর মধ্যেই দ্বিতীয় আরেকটি টিকা আবিষ্কারেরও দাবি তুলেছে দেশটি। চীনে গত এক মাস ধরেই আরব আমিরাত, পেরু এবং আর্জেন্টিনার পাশাপাশি তাদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শরীরেও টিকা প্রয়োগ কার্যক্রম চলছে। ভারতেও অক্সফার্ড টিকার তৃতীয় পর্বের হিউম্যান ট্রায়াল শুরু হয়ে গেছে। গত বুধবার পুনে শহরের ভারতী হাসপাতালে দুজন স্বেচ্ছাসেবীর দেহে প্রথম প্রয়োগের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ভারতে কোভিশিল্ড নাম নেয়া এই টিকার ট্রায়াল। আশার বাণী শোনাচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলোও। সিনোফার্ম নামে চীনা কোম্পানি বলছে, ডিসেম্বরেই তারা ভ্যাকসিন বিক্রি করতে শুরু করবে যার দাম পড়বে বাংলাদেশি মুদ্রায় মোটামুটি ১২ হাজার টাকার মতো। বিশ্বজুড়ে যে ছয়টি করোনা টিকা চূড়ান্ত পর্বের ট্রায়ালে রয়েছে তার মধ্যে তিনটাই চীনা টিকা। চীন আরো জানিয়েছে, তার দেশ টিকা উদ্ভাবন করলে সেটি প্রথম পাবে চীনা জনগণ এবং এরপর পাবে তার দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীরা। এদিকে টিকা উৎপাদনে ভারত-ব্রিটেনের যৌথ উদ্যোগের ট্রায়ালপর্বে শামিল হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। তাছাড়া চীনের কোম্পানি সিনোভ্যাক বায়োটেকের উৎপাদিত টিকাটির ভাগ পাওয়ারও ক্ষেত্রে আশা চাঙ্গা রয়েছে দেশটির।

টিকাপ্রাপ্তির দৌড়ে যথারীতি এগিয়ে আছে শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলিই। যুক্তরাজ্য তিন কোটি ডোজ টিকার প্রাপ্যতা আগেই নিশ্চিত করে রেখেছে জার্মানির বায়োএনটেক এবং মার্কিন ফাইজার কোম্পানির কাছে। ব্রিটিশ-সুইডিশ কোম্পানি আস্ট্রাজেনেকার টিকা তৈরি হলে সেখানেও তারা পাবে ১০ কোটি ডোজ। ব্রিটিশ জিএসকে এবং ফরাসি সানোফির টিকা তৈরি হলে সেখান থেকেও তারা পাবে ৬ কোটি ডোজ। আস্ট্রাজেনেকার কাছ থেকে আরো ৪০ কোটি ডোজ টিকা নেবে বলে আগাম চুক্তি করেছে নেদারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি। পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। বায়োএনটেক এবং ফাইজারের সঙ্গে তারা আগাম চুক্তি করেছে ৬০ কোটি ডোজ টিকার জন্য। পাশাপাশি আস্ট্রাজেনেকার কাছ থেকে তারা নেবে ৩০ কোটি ডোজ এবং নোভাভ্যাক্সের কাছ থেকেও নেবে আরো ১০ কোটি ডোজ।

অস্ট্রেলিয়া বলেছে, টিকা হাতে আসার পর দেশের আড়াই কোটি নাগরিকের কাছে বিনা মূল্যে সেটি পৌঁছে দেয়া হবে। প্রথম কারা এসব টিকা পাবে সে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রথম টিকা পাবে সম্মুখসারিতে যুদ্ধরত ডাক্তার ও নার্সরা। এরপর পাবে দেশের ৬৫-উর্ধ্ব নাগরিকরা। এরপর পাবেন তারা, যারা ভুগছেন হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস কিংবা জটিল শ্বাসকষ্টের অসুখে। এরপর পাবেন সেসব মানুষ যারা কাজ করেন নিত্য প্রয়োজনীয় খাতে। সবশেষে টিকা পাবেন আপামর সাধারণ জনগণ।

অন্যদিকে বৈশি^ক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধনী দেশগুলো এসব টিকা কুড়িয়ে-কাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর গরীব দেশগুলোর জন্য, যাদের হাতে টিকা কেনার মতো টাকা, কিংবা নিজেরাই তা উৎপাদনের সামর্থ্য কোনোটাই নেই, তাদের প্রাপ্তিযোগ থাকবে সামান্যই, কিংবা একেবারেই শূন্য। আবিষ্কারের প্রথম বছরে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত টিকা উৎপাদন হবে না বিশে^। ফলে নিজের চাহিদা মিটিয়ে অন্যকে দানের সুযোগ থাকবে অল্পই। প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ২০০৯ সালেও। সেবার সোয়াইন ফ্লুর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়ামাত্র ধনী দেশগুলি তা সাবাড় করে দেয় মুহূর্তে। গরিব দেশগুলো অসহায় পড়ে থাকতে বাধ্য হয় টিকা-বাজারের বাইরে। এসব বৈষম্য ও জটিলতা কাটিয়ে সব দেশের সমান সুযোগ নিশ্চিতে কোভ্যাক্স নামে নতুন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে বিশ্বে। সংকট উত্তরণে করণীয় নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে তারা। ডকটরস উইদাউট বর্ডারস বলে ডাক্তারদের একটি ফ্রন্ট বারবারই সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, দায়িত্বশীলতার বিষয়টি ভুলে না যাওয়ার জন্য। এছাড়া ‘অলাভজনক’ ভিত্তিতেও টিকা তৈরির ঘোষণা দিয়েছে অনেক ওষুধ কোম্পানি।

করোনাটিকা হতে হবে বিশ্বমানবতার জনস্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণকর, বলেছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মেরকেল। ইউরোপীয় কমিশন সভাপতি উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, টিকার এমন দাম রাখতে হবে যা বিশে^র যে কোনো প্রান্তের যে কোনো মানুষের কেনার সামর্থ্য রয়েছে। গ্লোবাল ভ্যাকসিন সামিটে একই কথা বলেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোন। তবে বিশ^নেতাদের এসব বড় বড় বুলিতে আস্থা রাখতে পারছেন না আরো অনেকেই। কেননা, অনেক দেশই টিকার বিষয়টিকে বিবেচনা করছে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে। ফলে গোপন চুক্তি করা থেকে বিরত থাকার কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছে না তারা। যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যেই অনেকগুলো কোম্পানির সাথে চুক্তি করে রেখেছে, যেসব চুক্তির শর্ত প্রকাশ করেনি তারা। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক এ বিষয়ে বলেছেন, ভাইরাসটি যেমন কোনো সীমান্ত মানেনি, তেমনি ভ্যাকসিনকেও যেন কোনো সীমান্ত মানতে না হয়। তবে প্রশ্ন একটাই- সবার আগে ভাবতে হবে ব্রিটেনের কথা। তার ভাষায়, ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই সবার আগে আমাকে ভাবতে হবে প্রতিটি ব্রিটিশ নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত টিকা নিশ্চিত করার কথা। ব্রিটেন যদি মনে করে, নিজেদের প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন পেতে সমস্যা হচ্ছে তাদের, তারা অনায়াসে তাদের টিকা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেবে। এই কাজ তারা আগেও করেছে। মহামারির শুরুর দিকেই ইতালি যখন গভীর গাড্ডায় পড়ে, প্রয়োজনীয় মাস্কের জন্য এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে, ঠিক তখনই ফ্রান্স ও জার্মানি সিদ্ধান্ত নেয়, প্রয়োজনীয় এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম কাউকে রপ্তানি করা যাবে না। ইইউ একই সুরে সুর মিলিয়ে বলে, নিজেদের মধ্যে এগুলো আদান-প্রদান করা যাবে, তবে ব্লকের বাইরে কোনো দেশে এসব সামগ্রী রপ্তানি করা যাবে না। এ বিষয়ে হ্যানকক কিছুটা আশ্বাসবাণী উচ্চারণ করে বলেন, টিকার ব্লু-প্রিন্ট একবার পেয়ে গেলে তখন অবশ্য যে কেউ এটি উৎপাদন করতে পারবে। সেখানে কোনো বাধা থাকবে না।

তবে তিনি যেটি বলেননি সেটি হচ্ছে টিকা উদ্ভাবনের মেধাসত্ত্ব বা কপিরাইটের বিষয়টি, যার একটি সমাধান হতে পারে টিকার কপিরাইট শেয়ার করা। বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো যদি তাদের ফর্মুলা অন্যদের হাতে তুলে দিতে রাজি থাকে তখন ফর্মুলা অনুসারে উৎপাদন করাটা খুব বড় বাধা হবে না। দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ টিকা উৎপাদন সম্ভব হবে। ফলে পৃথিবীর কারো কাছেই দুষ্প্রাপ্য থাকবে না করোনাটিকা। সমস্যা হচ্ছে, বিশ্বে একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এখনো গড়ে তোলা হয়নি, যাদের একইসঙ্গে এই টিকা উৎপাদন ও তার সুষম বণ্টনের সামর্থ্য ও ক্ষমতা রয়েছে। ঠিক এই কাজটাই এখন করার চেষ্টা করছে কোভ্যাক্স। গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়ান্স, সিইপিআই এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বয়ে তারা বৃহদাকার ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিপন্ন জনগোষ্ঠী ও দেশগুলোর জন্য ২০০ কোটি ডোজ টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, করোনা-মহামারির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার সর্বোত্তম পথ হচ্ছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্বে যাদেরই প্রয়োজন তাদের সবার হাতেই টিকা পৌঁছানো। এটাই সর্বোত্তম উইন-উইন পরিস্থিতি। কেননা, যতক্ষণ বিশ্বে একজন মানুষও ভাইরাসের ঝুঁকিতে থাকবেন, ততক্ষণ গোটা বিশ্বই রয়ে যাবে করোনা-ঝুঁকিতে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English