মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদা দিয়েছেন মানুষকে। আর মানুষের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন মুহাম্মদ (সা.)-কে। যাঁর মর্যাদাকে তিনি সব নবী-রাসুলের মর্যাদার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী, আমি আপনার মর্যাদাকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছি।’ (সুরা : ইনশিরাহ, আয়াত : ৪)
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে আমার হাবিব! আপনাকে যে মর্যাদা দিয়েছি, অন্য কোনো নবীকে সেই মর্যাদা দিইনি। আরশ থেকে শুরু করে কোরআনের পাতায় পাতায় যেখানে আমার নাম উচ্চারণ করিয়েছি, সেখানে আপনার নামও উচ্চারণ করিয়েছি। (ইবনে কাসির)
শুধু তা-ই নয়, যেই ভূমিতে জন্ম নিয়েছিলেন প্রিয় নবী (সা.), তাঁর সম্মানার্থে সেই ভূমির কসম করেছেন মহান আল্লাহ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি শপথ করছি এই নগরীর, আর আপনি এই নগরীরই অধিকারী।’ (সুরা : বালাদ, আয়াত : ১-২)
কারণ তিনি ছিলেন সেই পবিত্র শহরের বাসিন্দা ও নাগরিক। মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে কতটা সম্মান দিয়েছেন, তা বোঝার জন্য এই একটি আয়াতই যথেষ্ট। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, তোমাদের কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি, অতঃপর তোমাদের কাছে যা আছে তার প্রত্যয়নকারীরূপে যখন তোমাদের কাছে একজন রাসুল আসবে তখন তোমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮১)
ওই আয়াতে মহান আল্লাহ সব নবীকে হুকুম করছেন যে, যখন শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব হবে, তখন সব ধর্ম রহিত হয়ে যাবে। সবাইকে তাঁর ওপর ঈমান আনতে হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-কে এতটা সম্মানিত করেছেন যে তিনি পবিত্র কোরআনে আগের নবীদের নাম ধরে ডেকেছেন। যেমন—ইয়া আদম, ইয়া মুসা, ইয়া ঈসা ইত্যাদি। কিন্তু পবিত্র কোরআনের কোনো জায়গায় মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবীকে নাম ধরে ‘ইয়া মুহাম্মদ’ ডাকেননি।
সাধারণত দুনিয়াতে বিভিন্ন কীর্তিমান লোকের নামে এলাকার নাম, রাস্তাঘাটের নাম কিংবা ভবনের নাম হয়। কিন্তু কারো ব্যক্তিগত জিনিসের নামে সাধারণত রাস্তাঘাট, এলাকা, ভবন ইত্যাদির নাম রাখা হয় না। অথচ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আমাদের প্রিয় নবীর নামে ‘সুরা মুহাম্মদ’ নামকরণ করেছেন। আমাদের প্রিয় নবী কম্বল পরেছিলেন, তা দেখে আল্লাহর পছন্দ হয়েছিল, সেই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে একটি সুরার নাম করেছেন ‘সুরা মুদ্দাসসির’ করে।
মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবের মতকে সম্মান দিয়ে মুসলমানদের কিবলা পরিবর্তন করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আকাশের দিকে তোমার বারবার তাকানোকে আমি অবশ্যই লক্ষ করি। সুতরাং তোমাকে অবশ্যই এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি যা তুমি পছন্দ করো। সুতরাং তুমি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরাও। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৪)
এখানেই শেষ নয়, আবু লাহাব যখন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-কে নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেছে, তার প্রতিবাদে স্বয়ং আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আয়াত নাজিল করে দিলেন, ‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। (সুরা : লাহাব, আয়াত : ১)
সাধারণত দুনিয়ার নিয়মেও কোনো রাষ্ট্রের বিষয়ে কেউ তির্যক মন্তব্য করলে প্রধানমন্ত্রী নিজে তার জবাব দেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রীরাও সে কাজটি না করে আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দিয়ে তার মন্তব্যের জবাব দেওয়া হয়। কিন্তু আবু লাহাব যখন প্রিয় নবী (সা.)-কে নিয়ে তির্যক মন্তব্য করল, সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহ নিজে তার প্রতিবাদ করলেন। মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে এতটাই সম্মান দিয়েছেন যে তাঁর সম্পর্কে আবু লাহাবের মতো একজন নগণ্য বান্দার উক্তির জবাব তিনি নিজে দিয়েছেন।
এমনকি মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে উদ্দেশ করে বলেন, হে আমার নবী! কাফিরদের ষড়যন্ত্রে আপনি কখনো বিচলিত হবেন না। তাদের ষড়যন্ত্রের জবাব আমি আল্লাহ নিজে দেব। আমিই আপনার জন্য যথেষ্ট। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমিই যথেষ্ট তোমাদের জন্য বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে’। (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৫)
প্রিয় নবী (সা.)-এর চারিত্রিক সনদ দিতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা : কলম, আয়াত : ৪)
এভাবেই অসংখ্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধুর প্রতি বিরল ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।