ইসলামী বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল মানবজাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। মানবসমাজের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের লক্ষ্যে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসে মহান আল্লাহ তায়ালা শান্তির বাণীবাহক ও দূতরূপে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:কে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। মহানবী সা: পরিবার, সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে শান্তি, কল্যাণ ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তৎকালীন যুগে সমাজে অবহেলিত, নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত নারীদের মান-মর্যাদা এবং ন্যায্য অধিকারও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
ইসলামপূর্ব জাহেলি আরব সমাজে নারীর কোনো মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ছিল না। সে সময় নারীরা ছিল নিপীড়িত-নির্যাতিত ও অবহেলিত। তাদের গণ্য করা হতো ভোগের বস্তু হিসেবে। রাতের বেলায় নারী, মদ ও গান-বাদ্যের মহোৎসব করত। নারীজাতিকে পরিবার, সমাজ ও বংশের জন্য অসম্মান ও অভিশাপ মনে করা হতো। এমনকি সামাজিক লজ্জার ভয়ে নারীকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। সেই তিমিরাচ্ছন্ন কলুষিত সমাজকে নিষ্কলুষ করার জন্য ঠিক তখনই বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ধরার বুকে আবির্ভূত হলেন।
বিশ্বনবীর কল্যাণে মহীয়সী পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হলো নারীর অধিকার ও মর্যাদা। পবিত্র কুরআনে পুরুষদের সাথে নারীদেরও সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে দেয়া হয়। একইভাবে মায়েদের, স্ত্রীদের, কন্যাদের, স্বামীদের সম্পত্তির এবং বিশেষ অবস্থায় বোনদের-ভাইদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার সাব্যস্ত করা হয়েছে। একইভাবে নারীদের স্বামীদের সম্পদের মালিকানা দান করেছে। স্বামীর এ অধিকার নেই যে, স্বামী হওয়ার কারণে সে তার স্ত্রীর সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করবে। ইসলামের আগে পৃথিবীর বুকে আর কোনো ধর্মই এভাবে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেনি।
নারীজাতির প্রতি নবীজীর দয়া ছিল বেশি। একবার ওয়াইস করনি রা: নবীজীর কাছে খবর পাঠালেনÑ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার সাথে আমার দেখা করতে মন চায়; কিন্তু আমার মা অসুস্থ, এখন আমি কী করতে পারি? নবীজী সা: উত্তর পাঠালেন, ‘আমার কাছে আসতে হবে না। আমার সাথে সাক্ষাতের চেয়ে তোমার মায়ের খেদমত করা বেশি জরুরি।’ রাসূল সা:-এর যুগে প্রসিদ্ধ এই ঘটনার কথা হয়তো অনেকেরই জানা। মায়ের সেবা করার কারণে হজরত ওয়াইস করনি রা: প্রিয় নবীর যুগে থেকেও সাহাবি হতে পারেননি। নবীজী সা: তাঁর গায়ের একটি মোবারক জুব্বা ওয়াইস করনির জন্য রেখে যান। তিনি বলেন, ‘মায়ের খেদমতের কারণে সে আমার কাছে আসতে পারেনি। আমার ইন্তেকালের পরে তাকে আমার এই জুব্বাটি উপহার দেবে।’ জুব্বাটি রেখে যান হজরত ওমর রা:-এর কাছে এবং প্রিয় নবী সা: বলেনÑ ‘হে ওমর! ওয়াইস করনির কাছ থেকে তুমি দোয়া নিয়ো।’
রাসূল সা: ইরশাদ করেনÑ ‘যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান আছে যাদের সে লালন পালন করে এবং তাদের সাথে সদয় আচরণ করে, তার জন্য অবশ্যই জান্নাত ওয়াজিব।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি দুটি মেয়ে থাকে? নবীজী বললেন, দুটি থাকলেও।’ (বুখারি : ২৪৮১) তিরমিজি শরিফে বর্ণিত, মহানবী সা:-এর মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে এলো, তখন তিনি সবাইকে সমবেত করে বলেছিলেনÑ ‘আমি তোমাদের আমার এই শেষ অসিয়ত (উপদেশ) করছি যে, নারীদের সাথে যেন সর্বদা উত্তম আচরণ করা হয়।’ নবীজী বলেছেনÑ ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ (তিরমিজি : ১৯৫৭)
দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলছে। পারিবারিক নির্যাতন ছাড়াও প্রতিদিনই নারী নির্যাতন হচ্ছে। বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রায়ই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে যৌতুকের দায়ে নারীকে হত্যা, আগুনে পুড়িয়ে দেয়া, চুল কেটে ফেলাসহ বিভিন্ন বর্বর নির্যাতনের ভয়াবহ ঘটনা। এ দেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা নৈমিত্তিক ব্যাপার। নারীরা যেন আজ সর্বত্র অনিরাপদ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে নির্মমভাবে নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা যেন আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুুগকে হার মানাবে! নারীর প্রতি সংহিসতার মূলে রয়েছে নারীর প্রতি বৈষম্য। এ ছাড়া নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ও দায়ী। নারী সহিংসতা রোধে নারী-পুরুষের নৈতিক শিক্ষা, ধর্মের প্রকৃত জ্ঞান এবং অনুশীলন জরুরি। ইসলাম প্রদত্ত নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।