রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ন

পথের হক

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২০
  • ১২৬ জন নিউজটি পড়েছেন

রাস্তায় চলাচল বা অবস্থান করার ক্ষেত্রে বিশেষ শিষ্টাচার রয়েছে। চালচলন ও বিনম্র আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মনুষত্বের বিকাশ সাধিত হয়। অতি উৎফুল্লভাব ও দাম্ভিকতার সাথে রাস্তায় হাঁটাচলা করা অহঙ্কারের শামিল এবং আল্লাহ তায়ালা দাম্ভিক লোককে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর চলাচলে মধ্যমপন্থী হও।’ (সূরা লুকমান : ১৯) মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে রাস্তাঘাটে চলাচল করা আদবের অন্তর্ভুক্ত। তেমনি রাস্তারও কিছু হক রয়েছে যেগুলো আদায় করাও এক প্রকার আদব। হজরত আবু সাঈদ খুদরী রা: বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা: বলেন, ‘তোমরা রাস্তার ওপর বসা ছেড়ে দাও। লোকজন বলল, এ ছাড়া আমাদের কোনো পথ নেই। কেননা এটাই আমাদের ওঠা-বসার জায়গা এবং আমরা এখানেই কথাবার্তা বলে থাকি। নবী সা: বলেন, যদি তোমাদের সেখানে বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে। তারা বলল, রাস্তার হক কী? তিনি বললেন, দৃষ্টি অবনত রাখা, কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেয়া, সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা’ (বুখারি : ২৪৬৫)। আর রাস্তার হকগুলো আদায় করাতে রয়েছে বিশেষ কল্যাণ ও উপকারিতা।
মানবদেহের ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে চোখ সবচেয়ে বেশি কার্যকরী এবং অন্তরের ওপর অধিক প্রভাব সৃষ্টিকারী। রাস্তায় সব শ্রেণীর মানুষের চলাচল থাকে। সুতরাং কোনো অশ্লীল, নিষিদ্ধ কিংবা বেগানা নারী-পুরুষের প্রতি দৃষ্টি পড়া স্বাভাবিক। আর দৃষ্টি হলো জিনার আহ্বায়ক। রাসূল সা: বলেছেন, চোখের জিনা হলো দৃষ্টিপাত করা (বুখারি : ৫৮৮৯)। বদনজর হলো শয়তানের বিষাক্ত তীর (কানযুল আমাল : ১৩০৬৮)। তাই চলাফেরার সময় কোনো বেগানার প্রতি হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে গেলে পুরুষ কিংবা নারী উভয়ের জন্য সাথে সাথে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া উচিত, তাকিয়ে থাকা হারাম। যদি কেউ দৃষ্টি হেফাজত করে তবে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে কল্যাণ। হজরত আবু উমামা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘কোনো মুসলমান যদি সুন্দরী কোনো মহিলার প্রতি দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার পর দৃষ্টি নামিয়ে নেয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন ইবাদতের সুযোগ দেবেন যাতে সে তৃপ্তি পাবে’ (মুসনাদু আহমদ : ২২২৭৮)।
যেসব শর্তে রাস্তায় বসা, সভা করা বা সমবেত হওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম যে, পথচারীকে চলাচলের সময় কোনোরূপ কষ্ট দেয়া যাবে না। পথচারী স্বাচ্ছন্দ্যে, বাধাহীনভাবে পথ চলবে। রাস্তা কোনোভাবেই বন্ধ করে দেয়া কিংবা সঙ্কুচিত করার সুযোগ নেই বরং পথচারীর কষ্ট হয় এমন জিনিস রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলাই ইমানের অংশ। রাসূল সা: বলেন, ‘ইমানের সত্তরের বেশি শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা (ইবন মাজাহ : ৫৭)।
পথে বসে থাকা মানুষকে যদি পথচারী সালাম দেয় তাহলে তার সালামের উত্তর দিতে হবে। সালাম প্রদানের সাধারণ নিয়ম সম্পর্কে আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘সালাম দেবে ছোট বড়কে, পথচারী বসা ব্যক্তিকে এবং কমসংখ্যক অধিক সংখ্যককে’ (বায়হাকি : ৮৮৬২)। কেউ সালাম দিলে তার উত্তর দেয়া ওয়াজিব। যদি কেউ সালামের জবাব না দেয় তাহলে সে গুনাহগার হবে। সালামদাতাকে তার চেয়ে সুন্দরভাবে উত্তর শুনিয়ে দেয়া উত্তম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যখন তোমাদেরকে যথাযোগ্য সম্মানসহকারে সালাম দেয়া হবে, তাহলে তোমরাও তার সালামের জবাব দাও, তার চেয়ে উত্তমভাবে অথবা তারই মতো ফিরিয়ে বলো’ (সূরা নিসা : ৮৬)।
রাস্তায় বসে থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম একটি দায়িত্ব হলো মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। এগুলো একজন মুমিনের স্বভাবগত দায়িত্ব সব সময়ের জন্য। কিন্তু পথে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের পদচারণার কারণে খারাপ কাজ সংঘটনের মাত্রা বেশি থাকে, আবার আদেশ করারও সুযোগ সৃষ্টি হয়। শরিয়ত পরিপন্থী কোনো কাজ হতে দেখলে তাতে বাধা দিতে হবে। তাই এটিকে রাস্তার হক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। হজরত হামজা ইবন আবু উসাইদ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ‘একদা রাসূল সা: মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখলেন রাস্তায় পুরুষরা নারীদের সাথে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তখন তিনি নারীদের বললেন, তোমরা একটু অপেক্ষা করো। কারণ তোমাদের কর্তব্য হলো রাস্তার পাশ দিয়ে চলাচল করা। সুতরাং মহিলারা রাস্তার পাশ দিয়ে চলাচল করত এবং দেয়ালের সাথে তাদের চাদর আটকে যেত (আবু দাউদ : ৫২৭২)।
যাত্রাপথে পথচারীরা নানা রকমের বিপদের সম্মুখীন হয়ে থাকেন। সেটা হতে পারে কোনো দুর্ঘটনা কিংবা জালিমের নির্যাতন। কোনো পথিক এমন বিপদের শিকার হলে রাস্তায় অবস্থান করা মানুষের উচিত বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা। এটি একটি উত্তম আমল। কেননা দুনিয়াতে কেউ কাউকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে মহাবিপদ থেকে রক্ষা করবেন। রাসূল সা: বলেছেন, মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই। কেউ কারো প্রতি জুলুম করে না এবং শত্রুর কাছে সোপর্দ করে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। যে মুসলমানের একটি কষ্ট লাঘব করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার একটি কষ্ট লাঘব করবেন (আবু দাউদ : ৪৮৯৩)।
নতুন বা দূরবর্তী কোনো স্থানে গমন করলে অনেকে পথের দিশা খুঁজে পান না। পথিক তখন মারাত্মকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন। এমন অবস্থায় পথিককে পথের সন্ধান দেয়া অত্যন্ত মহৎ ও সওয়াবের কাজ। রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘পথহারা ব্যক্তিকে পথ চিনিয়ে দেয়া তোমার জন্য সাদকা’ (তিরমিজি : ১৯৫৬)। তেমনিভাবে অসুস্থ, শিশু, বৃদ্ধ, অন্ধ ও প্রতিবন্ধীদেরকে রাস্তা পারাপারে সহযোগিতা করাও এ আমলের অন্তর্ভুক্ত।
সাধারণত ভারী বোঝা বহন করার জন্য বাহন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কিছু সময় এই বোঝা বাহনে উঠানো একার পক্ষে সম্ভব হয় না। ব্যক্তি পর্যায়ে মাথায় বা কাঁধে ভারী বোঝা উঠাতে সাহায্যের প্রয়োজন হয়। ভারী বোঝা নামানো অনেক কষ্টের। কেউ যদি এমতাবস্থায় কাউকে সাহায্য করে তবে সেটা অনেক কল্যাণকর। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘কোনো ব্যক্তিকে সওয়ারিতে উঠানো বা তার সামানা বহনে সহযোগিতা করাও একটি সাদকা’ (বুখারি : ২৮২৭)।
পরিশেষে, যাদের রাস্তায় বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই কিংবা রাস্তার পাশে সভা-সমাবেশে মিলিত হয় তাদের উচিত রাস্তার হক আদায় করা। প্রতি ক্ষেত্রে রয়েছে অসংখ্য কল্যাণ ও উপকার। রাস্তার হকগুলো আদায় করলে সেখানে মন্দ কাজ সংঘটিত হওয়া দুরূহ ব্যাপার। অশ্লীলতা, গিবত, গালিগালাজ, কটুকথা, বাজে কথা ও কাউকে কষ্ট দেয়ার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সামাজিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক ভালোবাসা, দায়িত্ব ও সম্মানবোধ বিরাজ করবে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English