নায়িকা পরীমনি, মডেল মরিয়ম আক্তার মৌ, ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসা ও কথিত প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজসহ এ সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তারের পর বিশেষ মহলে শুরু হয়েছে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের পালস্না। বিশেষ করে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ সিআইডি এ চক্রের সঙ্গে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অনেকের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা বললেও তাদের নাম প্রকাশ না করায় এ খেলায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সুযোগ সন্ধানী অনেকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ভিআইপিদের কাউকে পরীমনি সিন্ডিকেটের গডফাদার, কাউকে পেস্নজার টু্যরের সঙ্গী কিংবা কোটি টাকার গিফটদাতা বা এ চক্রের বস্ন্যাকমেইলিংয়ের শিকার হিসেবে প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কেউ কেউ মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে ইউটিউবার দিয়ে মনগড়া তথ্যের ভিডিও তৈরি করে তা প্রচারের চেষ্টা করছেন। অনেকে আরও এককাঠি এগিয়ে সংবাদমাধ্যমকে এ কাজে ব্যবহারের ফন্দি এঁটেছেন। পুলিশের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রেষারেষির জের ধরে পরীমনি সিন্ডিকেটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে-কেউ কেউ তা প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। পরীমনি সিন্ডিকেট ঘিরে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের পালস্নার ঘটনায় খোদ গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এ ধরনের অপতৎপরতায় নিরপরাধ অনেকে বিপদে পড়তে পারেন। এ সুযোগে জাল কেটে বেরিয়ে যেতে পারে মূল অভিযুক্তরা। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে পরীমনি সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে দাঁড় করানো হলে তদন্তকাজও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, পরীমনি সিন্ডিকেটকে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের ঘনিষ্ঠ তিনশ’ ব্যক্তির একটি নামের তালিকা পাওয়া গেছে-এমন তথ্য দিয়ে কেউ কেউ সম্ভ্রান্ত লোকজনকে বস্ন্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে তারা এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। এদিকে কেউ কেউ দাবি করছেন, পরীমনি সিন্ডিকেটের সঙ্গে ভিআইপিদের হট কানেকশন থাকার বেশকিছু তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তারা তা প্রকাশ করতে পারছেন না। রোববার একটি অনলাইন টকশোতে উপস্থাপিকার প্রশ্নের জবাবে একজন সাংবাদিক বলেন, পরীমনি কানেকশনের ভিআইপিদের নাম জানা থাকলেও তিনি তা বলবেন না। কারণ যিনি সাড়ে তিন কোটি টাকার গাড়ি কাউকে গিফট করতে পারেন, তিনি চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন। এ টকশোতে অংশ নেওয়া অপর একজন বক্তা পরীমনি সিন্ডিকেটের হোতাদের পার পেয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে অনলাইনে টকশোতে যুক্ত থাকা পুলিশের শীর্ষস্থানীয় একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, সিআইডি এর আগেও চাঞ্চল্যকর অনেক মামলা তদন্ত করেছে। তারা প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনেছে। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময় দিতে হবে। এদিকে সিটি ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন পরীমনিকে গাড়ি কিনে দিয়েছেন-এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাসরুর আরেফিন এ সংবাদকে ‘মিথ্যাচার’ দাবি করেন। পরীমনি ও পিয়াসাকে কখনো দেখেননি বলে দাবি করে তিনি রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট দেন। এতে বলেন, পরীমনি নামের কাউকে তিনি দেখেননি। তার ফোন নম্বর তার কাছে থাকার প্রশ্ন আসে না। তিনি কোনো ক্লাব বা পার্টিতে যান না। তার নিজের কোনো গাড়ি নেই। এ অবস্থায় একজন নায়িকা কিংবা মডেলকে গাড়ি কিনে দেওয়ার প্রশ্ন অবান্তর। মাসরুর আরেফিনের ভাষ্য, ‘আমি সত্যি জানি না, ঘটনা কী। বুঝি যে, আমাকে নিয়ে (অর্থাৎ এক অর্থে সিটি ব্যাংক নিয়ে) একটা সস্তা ষড়যন্ত্র চলছে।’ অন্যদিকে পরীমনির সঙ্গে একটি খ্যাতনামা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের সম্পৃক্ততা সংক্রান্ত একটি ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছে। এতে তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ও স্থিরচিত্র রয়েছে। একই ভিডিওতে আরও কয়েকজনের সঙ্গে পরীমনির বিশেষ সম্পর্ক থাকার কথাও বলা হয়েছে। এ ভিডিওটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভাইরাল হয়েছে। সিআইডি সূত্র বলছে, পরীমনি সিন্ডিকেটের রাতের রঙিন আসরে যাতায়াতকারীদের দীর্ঘ তালিকা তৈরি করলেও এতে মোট কতটি নাম আছে এবং কাদের নাম আছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা কিছু বলেনি। তারা জানিয়েছে, অনেক নাম পেয়েছে। এদের মধ্যে বিত্তশালী ও পদস্থ ব্যক্তিদের নামও আছে। যাচাই-বাছাই না করে এসব নাম প্রকাশ করা হবে না। কারণ এতে অনেক নিরীহ মানুষও বিপদে পড়তে পারেন। তদন্তে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরীমনি, পিয়াসা, মৌ ও রাজসহ ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট অভিজাত এলাকায় নিয়মিত আসর বসাত। আসরগুলোতে মদ পান, ডিজে পার্টিসহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ড চলত। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, মোবাইল ফোন, কললিস্ট, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপস থেকে সিন্ডিকেটভুক্তদের আসরে যাতায়াত করা বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। প্রাপ্ত নামের অনেকগুলোই ছদ্মনাম বা সাংকেতিক নাম। সিআইডি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তিগত তদন্তের সহায়তায় প্রকৃত নাম ঠিকানা, পেশা, আয়ের উৎস ইত্যাদি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে।