রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:২৪ অপরাহ্ন

পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪৭ জন নিউজটি পড়েছেন

নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার ১৯টি প্যাকেজে এক লাখ ছয় হাজার ১১৭ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি আটটি প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত। এগুলোর অর্থের পরিমাণ ৭৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু আগস্ট শেষে এসব প্যাকেজের ঋণ পুরোপুরি বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। বেশির ভাগ প্যাকেজের বিতরণের হার হতাশাজনক। দুটি প্যাকেজের অর্থ বিতরণই হয়নি। এর একটি আবার গঠিতই হয়নি।

গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রণোদনা প্যাকেজের বর্তমান অবস্থা জানাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে গত মাসে একটি চিঠি দিয়েছিল মন্ত্রণালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব প্যাকেজে সরাসরি যুক্ত সেগুলোর ৭৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক মাত্র ৩০ হাজার কোটি বিতরণ করেছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সব কটি ব্যাংকেই হতাশাজনক চিত্র। আমরা খুবই হতাশ। ব্যাংকগুলোর কোনো সমস্যা থাকলে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বলা উচিত।’ তিনি বলছিলেন, ‘করোনার কারণে ব্যবসায়ীরা এমনিতেই সমস্যায় আছে। ব্যাংকগুলো যদি ঠিকভাবে ঋণ বিতরণ না করে, তাহলে আরো সমস্যার সৃষ্টি হবে। আমরা ওয়ার্কিং ক্যাপিটালে (চলতি মূলধন) খুব বেশি সাপোর্ট পাচ্ছি না। এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনে সমস্যা আরো বাড়বে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন চিত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও হতাশ। বাস্তবায়ন আরো জোরদার করতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে সমস্যায় পড়বেন না—এমন আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, যেখানে বড়দেরই ঋণ পেতে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে ক্ষুদ্র, মাঝারিদের কী অবস্থা, তা সহজেই অনুমেয়। ছোটরা তো খুবই কম ঋণ পাচ্ছে। এ অবস্থা নিরসনে তাঁরা চেষ্টা করছেন। করোনার কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলাকালে ৫ এপ্রিল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়।

বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঋণ সুবিধা : বড় শিল্প ও সেবা খাতকে রক্ষায় সরকার ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। পরে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে যোগ করা হয় আরো তিন হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ২৩ হাজার ৪০০ কোটি বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে ১৭ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। বাকি পাঁচ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বেতন-ভাতা পরিশোধ বাবদ। বৃহৎ শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ জুন মাসে নিয়েছেন দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর জুলাই মাসে নিয়েছেন দুই হাজার ৯০৪ কোটি টাকা।

ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পের জন্য ঋণ : করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর। এ খাতকে সুরক্ষা দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এই ঋণ বিতরণের কথা রয়েছে। এই ঋণ পেতে ট্রেড লাইসেন্স, মালিকানার ধরনের সনদসহ বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র লাগে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারছে না। আবার ব্যাংকও জামানত ছাড়া ঋণ দেবে না। কারণ ঋণের টাকা আদায় না হলে এর দায় ব্যাংকগুলোকে নিতে হবে। ফলে আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে মাত্র তিন হাজার ৭০০ কোটি বিতরণ করতে পেরেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র শিল্পগুলো পেয়েছে মাত্র ৮০ কোটি টাকা।

রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বৃদ্ধি : রপ্তানিকারকরা যাতে সহজ শর্তে ঋণ পান সে জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের আকার ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। এর ফলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত হয়েছে। ঋণের সুদহারও কমিয়ে মাত্র ২ শতাংশ করা হয়। এই প্যাকেজের আওতায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ৭১৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এক হাজার ১০৯ জন সুবিধাভোগীকে এই ঋণ দেওয়া হয়েছে।

রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ : তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানিমুখী শিল্প যাতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে পারে সে জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এ পর্যন্ত ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১১৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

কৃষি পুনরর্থায়ন স্কিম : করোনা দুর্যোগ থেকে দেশের কৃষি খাতকে সুরক্ষা দিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনরর্থায়ন তহবিল গঠনের ঘোষণা আসে। ধান, গমসহ সব ধরনের শস্য, অর্থকরী ফসল, শাকসবজি ও কন্দাল (আলু, কচু) জাতীয় ফসল চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে কৃষকরা এই তহবিল থেকে ঋণ পাবেন। এই তহবিলের মেয়াদ শুরু হয়েছে ১ এপ্রিল থেকে। শেষ হবে আগামী বছরের ৩০ জুন। আগস্ট পর্যন্ত এর বাস্তবায়নের হার খুবই নগণ্য। মাত্র ৫০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে ১৭ হাজার ৯৮০ জন সুবিধাভোগীর অনুকূলে।

নিম্ন আয়ের পেশাজীবী কৃষক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পুনরর্থায়ন স্কিম : নিম্ন আয়ের পেশাজীবী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যাতে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন সে জন্য তিন হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এখন পর্যন্ত ৩৬ জন সুবিধাভোগীর অনুকূলে ২৬৬ কোটি টাকা পুনরর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

দুই মাসের ঋণের সুদ ‘ব্লকড হিসাবে’ স্থানান্তর : পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংকের সব ধরনের ঋণের ওপর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত আরোপিত/আরোপযোগ্য সুদ ‘সুদবিহীন ব্লকড হিসাবে’ স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকার ঘোষণা দেয়, সুদের টাকা ভর্তুকি দেওয়া হবে। এ জন্য দুই হাজার কোটি টাকা রাখা হয়। সুদ/মুনাফা ভর্তুকিপ্রাপ্তির জন্য ব্যাংকের আবেদন পাওয়ার শেষ সময় ছিল ১৫ জুলাই। কিন্তু সব ব্যাংক আবেদন করেনি। ফলে সময় বাড়ানো হয়েছে। সব ব্যাংকের আবেদন পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। তাই এখনো এই প্যাকেজ থেকে কোনো অর্থ ছাড় করা হয়নি।

এ ছাড়া রপ্তানিকারকদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-জাহাজীকরণ পুনরর্থায়ন তহবিল (প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফিন্যান্স স্কিম) গঠন করার কথা ছিল। সেটি এখনো গঠিত হয়নি বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ঋণের সুদের হার হবে ৬ শতাংশ। এই তহবিলের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ শতাংশ সুদহারে পুনরর্থায়ন সুবিধা পাবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English