রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:২৫ পূর্বাহ্ন

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে উম্মাহর করণীয়

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৪০ জন নিউজটি পড়েছেন

‘নিশ্চয়ই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃজনে ও রাত-দিনের পালাক্রমে আগমন ও প্রস্থানে বহু নিদর্শন রয়েছে ওইসব বুদ্ধিমানের জন্য যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে (এবং তা লক্ষ করে বলে ওঠে) হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি অনর্থক কাজ থেকে পবিত্র’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯০-১৯১)।
উল্লিখিত আয়াতের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষ জগতের যা কিছু দ্বারা উপকার লাভ করে তা সবই আল্লাহ তায়ালার দান। এর প্রত্যেকটি জিনিস আল্লাহ তায়ালার তাওহিদের নিদর্শন। এতদসত্ত্বেও তার সাথে কুফরি কর্মপন্থা অবলম্বন করা কত বড়ই না অকৃতজ্ঞতা!
এখন প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির কল্যাণে গোটা বিশ্বই এখন একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। মুহূর্তের মাঝে এক দেশের খবর চলে আসে অন্য দেশে। হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থানরত মানুষের সাথে কথা বলা যায় অনায়াসে। পৃথিবীর এই তাবৎ আবিষ্কার, প্রযুক্তির এই সব উন্নয়ন সবই ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য মহান আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ নিয়ামত। যার শুকরিয়া আদায় করা প্রতিটি বান্দার জন্য আবশ্যক। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে বেশি বেশি করে দেবো। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে (মনে রেখো) নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর’ (সূরা ইবরাহিম : ৭)।
শুকরিয়ার সর্বনিম্ন স্তর হলোÑ আল্লাহর নিয়ামতকে সঠিক স্থানে ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং আল্লাহর নাফরমানিতে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা। এমন কোনো প্রযুক্তিপণ্য বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নেই, যেটা ইসলামের খেদমতে ব্যবহারযোগ্য নয়। তবে জ্ঞাতব্য যে, প্রতিটি জিনিসকে ভালো কাজেও ব্যবহার করা যায়, আবার মন্দ কাজেও ব্যবহার করা যায়। দোষ কিন্তু জিনিসের বা প্রযুক্তির নয় বরং এখানে ব্যবহারকারী মূলত দায়ী। যেমনÑ টেলিভিশনের মাধ্যমে মন্দ ছবিও দেখ যায়, আবার সারা দিন ইসলামিক অনুষ্ঠানও দেখা যায়। লক্ষণীয় যে, প্রযুক্তিকে আমরা কোন কাজে ব্যবহার করছি সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আমরা যদি প্রযুক্তিকে ইসলাম প্রচারের কাজে লাগাই তাহলে সব ধরনের প্রযুক্তিই কল্যাণের মাধ্যম হবে। আর যদি এই কথা বলে পিছিয়ে থাকি যে, এগুলো ব্যবহার করা হারাম। তাহলে এগুলোর সুফল থেকে জাতি বঞ্চিত হবে। সব নবী-রাসূলই তাদের জামানায় তৎকালীন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন এবং নিজস্ব ধর্মের প্রচার-প্রসার করেছেন। তাঁরা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করেছেন। আমরাও যদি প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করি তাহলে তা হবে ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কল্যাণকর।
তবে প্রতিটি জিনিসেরই ভালো-খারাপ দিক রয়েছে। মানুষ চাইলে তাকে যেকোনো পথে ব্যবহার করতে পারে। প্রযুক্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। এটিকে যেমন ইসলামের খেদমতে ব্যবহার করা সম্ভব, তেমনি খারাপ পথেও তা ব্যবহার করা যায়। লক্ষণীয়, আমরা প্রযুক্তিকে কোন কাজে ব্যবহার করছি সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আমরা যদি প্রযুক্তিকে ইসলাম প্রচারের কাজে লাগাই তাহলে সব ধরনের প্রযুক্তিই কল্যাণের মাধ্যম হবে।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে দাঈদের ভূমিকা : তথ্য ও প্রযুক্তি মানুষের জীবন ও তার উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। মানুষের জীবন প্রবাহকে বেগবান করেছে। আর ইসলাম মানুষের জন্য যেকোনো কল্যাণকর জিনিসের সঠিক ব্যবহার অনুমোদন করে। তাই তথ্য ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে ইসলামের কোনো আপত্তি নেই। তথ্য ও প্রযুক্তির ভুল ব্যবহার হচ্ছে। কোনো জিনিসের ভুল ব্যবহার হলে তা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। বরং ভুল ব্যবহার বন্ধ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের আলেম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের দায়িত্ব মানুষকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তার জবাব আলেমদের পক্ষ থেকেই আসা উচিত। ইসলামের নামে অসংখ্য নতুন নতুন ফিৎনা, বিভ্রান্ত মতবাদের প্রতিবাদ ইলেকট্র্রনিক মাধ্যমে প্রচার করার দায়িত্ব আলেম সমাজের ওপরই বর্তায়। সাপ্তাহিক জুমার খুতবায় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে কী করণীয় সে সম্পর্কে আলোচনা করা জরুরি। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তি যতটা তৎপর, অধিকতর ঈমানের অধিকারী আলেম সমাজ তার চেয়ে বেশি তৎপর হবেন এটা আমাদের একান্ত কামনা। ইসলামের সঠিক দিক বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য ইন্টারনেট, টিভি, ইলেকট্র্রনিক ও অন্যান্য মিডিয়া ব্যবহার করা নাজায়েজ বলে ঘোষণা করা ‘মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা’র নামান্তর বলে মনে করি।
প্রযুক্তির সহজ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে ইসলামবিরোধীরা অনলাইনে নির্জলা মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নগ্নতাকে উসকে দিচ্ছে। নাস্তিকতার প্রচার ও ধর্মে অযথা অবিশ্বাস তৈরি করছে। আধুনিক জাহেলিয়াতের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ইসলামের প্রকৃত বার্তা মানুষের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব আলেম সমাজের। মানবজীবনের জন্য অতীব জরুরি আমলগুলো তথ্যসূত্রসহ তুলে ধরার মাধ্যমে ইসলামের বাস্তব অনুশীলনের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করা যেতে পারে।
আরবের আলেমরা ফেসবুক ব্যবহার করে ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। লাখ লাখ মানুষ তাদের পেজে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো পাঠ করছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের আলেমরা ফেসবুককে দাওয়াতের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে ইসলামের প্রচার-প্রসারে ভূমিকা পালন করতে পারেন। কুরআনের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত তত্ত্বগুলো যে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা প্রচারে আলেমদেরই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের আলেম সমাজেরই দায়িত্ব প্রযুক্তির এই দিকহারা জাহাজের পাল টেনে ধরার। সেই সাথে মানুষকে তার সঠিক ব্যবহার শিক্ষা দেয়া। ইসলামের খেদমতে প্রযুক্তিকে কিভাবে আরো শক্তিশালী করা যায় তা নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কারণ এখন মানুষ প্রযুক্তিনির্ভর। অফিস-আদালত, বই-পুস্তক, দোকান-পাঠ সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতা যেন আমাদের ধ্বংসের কারণ না হয়।
আল্লাহর এই অমূল্য নিয়ামতগুলো যাতে তাঁর নাফরমানিতে ব্যবহার না হয়, সে ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং এই প্রযুক্তিকে আল্লাহর নির্দেশ মতো ব্যবহারের উপযোগী করা আলেমদেরই দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘আমি পৃথিবীর সব কিছুকে পৃথিবীর জন্য শোভা করেছি, যাতে লোকদের পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে ভালো কাজ করে’ (সূরা কাহফ ১৮/৭)।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দাওয়াতের পদ্ধতি এক দিকে যুগোপযোগী ও উন্নতমানের হওয়া দরকার, অন্য দিকে সমকালীন বাতিল শক্তির মোকাবেলা করার মতো যোগ্যতা, দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগের সক্ষমতাও থাকা প্রয়োজন। সর্বসাধারণের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে উপরোক্ত মাধ্যমগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার।
তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে দাঈ ইলাল্লাহ তথা আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের জন্য তাওহিদের দাওয়াত বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার অপার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে হবে।
ইসলামের অপার সৌন্দর্য সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরতে হবে। জাহেলিয়াতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সর্বত্র পৌঁছে দিতে হবে কুরআনের আলো। আর সে প্রচেষ্টায় সবারই অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ইসলামের দাওয়াত বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন, আমীন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English