শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:০৫ অপরাহ্ন

ফুটবলকে বাঁচাবে কে?

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০
  • ৪৬ জন নিউজটি পড়েছেন

বাংলাদেশের ফুটবল সংগঠকদের একগুঁয়েমি নতুন নয়। ২০০২ সালের ঘটনায় ফুটবলে যে ধাক্কা এসেছিলো তা সামলে উঠা বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন ছিলো। ওই বছর রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে বাফুফের নির্বাচিত কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়। তৎকালীন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বিএনপিপন্থীদের নিয়ে একটি এডহক কমিটি গঠন করেন। সে কমিটি মেনে নেয়নি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এএফসি। এডহক কমিটি বাতিলের জন্য এএফসি সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলো।

কিন্তু সরকার তা মেনে না নিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিষিদ্ধ হয় বাংলাদেশের ফুটবল। এটিকে এখনো বাংলাদেশের ফুটবলের কালো অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। সেরকম পরিস্থিতি বর্তমানে না থাকলেও ফুটবলের রক্তক্ষরণের জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করছে সংগঠকরা। ফুটবলের মানোন্নয়নের জন্য তারা যতটা না কাজ করেন তার চেয়ে বেশি কাজ করেন বাফুফেতে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য।

মানের ক্রবানতি হতে হতে বিশ্ব-র‌্যাংকিংয়ের একেবারে তলানিতে চলে যাওয়া, নিয়মিত খেলার আয়োজন না থাকা, ভালো খেলার জন্য অবকাঠামোর উন্নয়ন না করা, ফুটবলারদের সন্তোষজনক পারিশ্রমিক না দেয়া, নিয়মিত ক্যাম্পিং এর আয়োজন না থাকা, সংগঠকদের দলাদলিসহ নানা কারণে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে ফুটবল। এক সময় ঢাকার ফুটবলে দর্শকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেলেও এখন নাম করা দলগুলোর খেলায়ও স্টেডিয়াম থাকে দর্শকশূন্য। বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে গত কয়েকদিনের অনুসন্ধানে ভয়ংকর কিছু তথ্য মিলেছে। যেসব বিবেচনায় যে কারো মনে হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে ফুটবলের মানোন্নয়নের আদৌ সম্ভাবনা নেই। এমনকি ফুটবলকে একটি মানে পৌঁছানোর জন্য ব্যক্তিবিশেষের উদ্যোগকেও কিভাবে নস্যাৎ করা যায়-তার প্রচেষ্টা দেখা গেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের(বাফুফে) মধ্যে। বিশ্ব ফুটবলে ২১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এখন ১৮৭তম স্থানে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অবস্থানও উপরে (১৪৯)।

তবে, ফুটবলের মান পড়ে যাবার জন্য খেলার মাঠে দর্শক আসছে না নাকি খেলার মাঠে দর্শক না আসার কারণে ফুটবলের মান উন্নয়ন হচ্ছে তা নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা আছে। প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম মূর্শেদি এজন্য খেলোয়াড়দের দায়ী করেছেন। তার মতে, ফুটবলে অনেক শক্তিশালী দল এসেছে। কিন্তু সেভাবে সমর্থক তৈরি হয়নি। এর কারণ হচ্ছে খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত পারফরমেন্স দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতে পারছে না। তারকা খেলোয়াড়ও কমে আসছে। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সম্মানি কম নয়। তারা সুযোগ ক্যাপিটালাইজ করতে পারছে না। ফুটবলে বাংলাদেশের ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি বলেন, জাতীয় দলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনতে পারিনি। আমাদের দুর্বলতাগুলো আমাদেরকেই সংশোধন করতে হবে।

ফিফা এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) বাফুফেকে প্রতিবছর ১২ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দেয়। এর মধ্যে সাত লাখ ডলার দেয় ফিফা আর পাঁচ লাখ ডলার দেয় এএফসি। সরকারও গত অর্থবছরে বাফুফেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্পন্সরের অর্থের পরিমাণও কম নয়। এতোকিছুর পরও বাংলাদেশের ফুটবলের মান দিন দিন পড়ছে। অবশ্য সরকারের বরাদ্দ ২০ কোটি টাকার মধ্যে ১০ কোটি টাকা বাফুফে খরচ করতে পারলেও তার সঠিক হিসেব না দিতে পারায় বাকি টাকা আটকে দিয়েছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।

বাফুফের বিভিন্ন স্তরে যেসব ফুটবল সংগঠক রয়েছেন তাদের অধিকাংশই এখন ফুটবলজীবী। অন্য কোন পেশা তাদের না থাকলেও ফুটবল দিয়ে তাদের জীবিকা ঠিকই চলছে। কিন্তু ফুটবলারদের পারিশ্রমিক বাড়ানো কিংবা তাদের মানোন্নয়নের বিষয়ে এসব ফুটবলজীবীদের তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। বাফুফের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাফুফেতে এমন কিছু কর্মকর্তা আছেন যাদের নিয়মিত বাজার খরচ বাফুফে থেকে ম্যানেজ হচ্ছে। কিন্তু আপতকালীন কোন ফুটবলার সমস্যায় পড়লে তার জীবন নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে। আরিফ হাওলাদার, রিপন কুমার দাস, হাসান আল মামুন-এর উদাহরণ এখানে প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু ফুটবল তাদের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এ কারণে তাদের একজন হয়েছেন রাজমিস্ত্রী, অন্যজন ঝাড়ুদার আর একজন ইজিবাইক চালক। নারায়ণগঞ্জের ছেলে আরিফ শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হয়েও খেলেছেন। বাসাবো তরুণ সংঘের হয়ে খেলেছেন খুলনার ইজিবাইক চালক হাসান আল মামুন। ফরিদপুরে ঝাড়ুদারের কাজ করা রিপন কুমার দাস টিএন্ডটি ক্লাবের হয়ে খেলতেন। বাংলাদেশের ফুটবল এখন যেন আরিফ, রিপন আর মামুনদের জীবনের মতো দোলাচলে দুলছে।

তবে কাগজে কলমে বাংলাদেশের ফুটবল একেবারে ঠিকঠাক। জাতীয় দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন লিগের কাঠামো আছে এখানে। প্রিমিয়ার লিগ, বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, পাইওনিয়ার লিগ ছাড়াও প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগের দলও রয়েছে এখানে। খেলাও হচ্ছে কিছু কিছু লিগের। কিন্তু এসব লিগের খেলার মান এবং ফুটবলের অবকাঠামো নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। মাঝেমধ্যে পাতানো খেলার অভিযোগও উঠেছে। এগুলোর তদন্ত করা কিংবা এ নিয়ে কথা বলার লোকও পাওয়া যায় না। তৃনমূল থেকে ফুটবলার তুলে নিয়ে আসার কাজও তেমন হচ্ছে না। এক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ে অবকাঠামো বিশেষ করে মাঠের দুরবস্থাকে দায়ী করছেন অনেকে।

এদিকে ফুটবলের মানোন্নয়নের জন্য বাফুফের বাইরে কিছু ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগ আছে। সেগুলোকেও নিয়মিত সহযোগিতা করে না বাফুফে। বিভিন্ন লিগ চালু রাখার জন্য বেসরকারি খাতে উদ্যোগ নেয়া হলেও সেগুলো এগিয়ে নেয়া যায়নি। কোন কোন সংগঠন এক্ষেত্রে ভালো কাজ করার চেষ্টা করলেও তাদেরকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়া হয়।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English