বর্ণবাদ কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি গাত্রবর্ণের কারণে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বৈষম্যমূলক আচরণের নাম। এটি সমাজ শোষণের এক অন্যতম হাতিয়ার। ইসলামে বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই। ইসলাম গোত্র ও বর্ণবাদ নির্মূল করে আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার উদাহরণ বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেছে।
বর্ণবাদ এমন দৃষ্টিভঙ্গি চর্চা এবং ক্রিয়াকলাপ যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে, মানুষ অনেকগুলো গোষ্ঠীতে (races) বিভক্ত এবং এক গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য উঁচু অথবা নীচু; কিংবা তার উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী; অথবা বেশি যোগ্য কিংবা অযোগ্য মনে করে। এটি কখনো গায়ের চামড়ার বর্ণের পাশাপাশি গোত্র ও আঞ্চলিকতা দিয়ে হতে পারে। আফ্রিকান ভাষায় এর অর্থ হলো ‘বিভাজন’ বা ‘বিচ্ছিন্নতা’।
১৯৩০ সালে প্রথম বর্ণবাদ শব্দের উৎপত্তি হয়। এটি দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকাতে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জাতিগত বিভাজন ব্যবস্থা। তৎকালীন শ্বেতাঙ্গ শাসিত সরকার আইন করে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিবাসীদের কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, দক্ষিণ এশীয়, বর্ণসংকর ইত্যাদি বর্ণে ভাগ করে। এভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী মূল ধারার সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।
তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় অর্থে ইসলাম কোনো জাতি, বর্ণ, অঞ্চল বা রঙের পার্থক্য মানে না। এক্ষেত্রে সাদা আর কালো, নাগরিক আর সৈনিক, শাসক আর শাসিত সব সমান। কুরআন ও হাদিসে গোষ্ঠীবাদ ও বর্ণবাদিতাকে নিষেধ করা হয়েছে। এসব বর্ণ ও জাতির ভিন্নতা আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন। মহান আল্লাহ বলেন, আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য। (সূরা রুম : ২২)
ধর্ম বিশ্বাস, গাত্রবর্ণ, শক্তি ও বংশের অহঙ্কারবশত কোনো ব্যক্তি বা জাতি কর্তৃক নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করাকে ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। কুরআনে এসেছে, হে মানবমণ্ডলী, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক পরহেজগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সব কিছুর খবর রাখেন। (সূরা হুজরাত : ১৩)
বিভিন্ন গোষ্ঠী ও বর্ণে বিভক্ত হয়ে এক জাতি অপর জাতিগোষ্ঠীর সাথে অন্যায় আচরণ ও অবিচার করা নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। (সূরা আল মায়িদাহ : ৮)
ইসলাম গোত্রবাদ ও বর্ণবৈষম্যকে প্রথম দিন থেকেই সমাজ, ধর্ম ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে অস্বীকার করেছে। গোষ্ঠীবাদ জাহেলি যুগের অন্যতম জঘন্য কর্ম। ইসলাম সর্বাগ্রে তাকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে সবার মাঝে ভ্রাতৃত্ববন্ধন সৃষ্টি করেছে। সবাইকে ভাই ভাই সম্পর্কের ভিত্তিতে এক আল্লাহর ইবাদত করতে আহ্বান জানিয়েছে।
ইসলাম গোত্রবাদ ও আভিজাত্য প্রদর্শনকে মূলোৎপাটিত করে। এটা পরস্পরকে শত্রুতা, ক্রোধ, অহঙ্কার ও হিংসাবিদ্বেষ উসকে দেয়। রাসূল সা: মদিনায় হিজরত করে সর্বপ্রথম আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদ নিরসন করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাছাড়া আনসার ও মুহাজিরদের মাঝেও ভ্রাতৃত্ববোধের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সুদূর পারস্যের ক্রীতদাস সালমানকে আহলে বাইতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আলী রা: বলেন, ‘সালমান আমাদেরই ঘরের লোক।’ কৃষ্ণবর্ণের হাবশি বিলাল রা:-কেও নেতার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে তিনি উসামাহ ইবনু জায়েদ রা:-কে পারস্যের সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেছেন, অথচ তখনো আবু বকর রা:, উমর রা: ও আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ-এর মতো প্রসিদ্ধ সাহাবিরা জীবিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, এসব নেতৃত্বের দ্বিধাহীন আনুগত্যের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূল সা: বলেন, কিশমিশ আকারের মস্তিষ্ক বিশিষ্ট কোনো হাবশি গোলাম কেউ যদি তোমাদের নেতা নিযুক্ত করা হয়, তবুও তোমরা তার কথা শুনবে এবং পূর্ণ আনুগত্য করবে। (বুখারি : ৬৭৬০)
এছাড়া মক্কা বিজয়ের সময় তিনি ঘোষণা করেন, জেনে রাখো! গর্ব অহঙ্কার গৌরব ও আভিজাত্যবোধ প্রভৃতির সব সম্পদ এবং রক্ত ও সম্পত্তি সম্পর্কিত যাবতীয় অভিযোগ আজ আমার এই দুই পদতলে নিপিষ্ট। তিনি আরো বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জাহেলি যুগের সব হিংসাবিদ্বেষ ও গর্ব অহঙ্কার এবং পৈতৃক গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ নির্মূল করে দিয়েছেন। হয়তো বা সে মুমিন-মুত্তাকি অথবা অন্যায়কারী দুর্ভাগা হবে। সব মানুষ আদম থেকে উৎসারিত। আর আদম মাটি থেকে।’ অতএব, ইসলামে প্রত্যেকের সমান অধিকার সুনিশ্চিত।
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম প্রজাদেরকে বলে ‘আহল উজ-জিম্মাহ’ বা ‘জিম্মি।’ শব্দটির অর্থ হলোÑ ‘যারা নিরাপত্তায় বাস করে। জিম্মিদের সম্পর্কে ইসলামী বিধান হলো ‘জিম্মির রক্ত মুসলমানের রক্তের মতো পবিত্র।’
মুহাম্মদ সা:-এর বর্ণবিদ্বেষ ও জাতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থানের দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই বিলাল ইবনে রাবাহ রা:-এর সাথে তার সম্পর্কে। বিলাল রা: ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ কৃতদাস। যিনি পরবর্তীতে আবু বকর রা:-এর মাধ্যমে দাসত্ব থেকে মুক্ত হন এবং মদিনায় মসজিদে নববীতে মুহাম্মদ সা: তাকে নামাজের আজান দেয়ার জন্য মুয়াজ্জিন হিসেবে নিযুক্ত করেন।
একবার বিশিষ্ট সাহাবি আবু জর গিফারি রা: তর্কের সময় বিলাল রা:কে ‘কালো মায়ের সন্তান’ বলে গালমন্দ করলে রাসূল সা: এতে বিরক্ত হন। তিনি তখন আবু জর রা:কে বলেন, ‘তুমি এমন ব্যক্তি, যার মধ্যে এখনো জাহেলিয়াতের চিহ্ন রয়েছে।’ রাসূল সা: এখানে আবু জর গিফারি রা:-এর বক্তব্যকে ‘জাহেলিয়াত’-এর সাথে তুলনা করেছেন।
বিদায় হজের ভাষণেও রাসূল সা: বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বলেছেন। তার বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের, কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের উচ্চ মর্যাদা নেই। একজন শ্বেতাঙ্গ একজন কৃষ্ণাঙ্গের তুলনায় এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ একজন শ্বেতাঙ্গের তুলনায় উচ্চতর নয়। পার্থক্য শুধু মানুষের চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমে।’
মুহাম্মদ সা:-এর জীবনের সর্বশেষ এই ভাষণটি তার জীবনের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ভাষণে তিনি সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করার বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে সমগ্র মানুষকে এক মানবতার পতাকাতলে একত্র হওয়ার আহ্বান জানান।
বর্তমান বিশ্বে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে বর্ণবাদ। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, বৈষম্য ও বর্ণবাদ দূরীকরণের ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও বিশ্ব থেকে এখনো বৈষম্য ও বর্ণবাদের অবসান হয়নি। এমনকি এই বর্ণবাদের কারণেই বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে। বিশ্ববাসীকে আজ এমন এক সমঝোতায় আসতে হবে, যাতে করে দুনিয়ায় আর বর্ণবাদ নামের কোনো কিছুর অস্তিত্ব না থাকে।
ইসলামের কোনো বিধানই বর্ণবাদের দায়ে দুষ্ট নয়। গোষ্ঠীবাদ ও বর্ণবৈষম্য নির্মূলে বিশ্ববাসী ইসলাম নির্দেশিত বিধান অনুসরণ করলে ঘৃণ্য এ অপতৎপরতা মূলোৎপাটন সম্ভব। বর্ণবাদী আচরণ বন্ধে ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাইকে আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।