শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:২১ অপরাহ্ন

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে দরকার সম্মিলিত প্রয়াস

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৪৫ জন নিউজটি পড়েছেন

করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে। বিশেষত মেয়ে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার হার বাড়ছে, ফলে বেড়ে যাচ্ছে বাল্যবিবাহও। এমনিতেই বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিদ্যালয় খুলতে দেরি হওয়ার সঙ্গে এই সমস্যা আরো বাড়তে পারে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, সংঘাত, দুর্যোগ কিংবা মহামারীর সময় বাল্যবিবাহের সংখ্যা বাড়ে। বাংলাদেশে ২০ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, করোনার কারণে আরো ২৩ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে গেছে বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন। তাই বাল্যবিবাহের ঝুঁঁকি এ সময়ে অনেক বেশি।

বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যাগুলোর মধ্যে বাল্যবিবাহ অন্যতম একটি। এক সময় বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের মহামারী আকার ধারণ করেছিল। এখনো যে বাল্যবিবাহ হয় না তা নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য এই শব্দটা বিভীষিকাময় এক কালো অধ্যায়। অনেকে বলেন এটি একটি সামাজিক অভিশাপ; কিন্তু সংশ্লিষ্ট অভিভাবকরা এটি সামাজিক বাস্তবতা বলে অভিহিত করে থাকেন।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৭-১৮ সালে বাল্যবিয়ের হার ছিল ৫৯%। কিশোরী মায়ের গর্ভধারণের হার ছিল ২৮%; যা ২০১৪ সালে ছিল ৩১%। কিন্তু করোনাকালে এ সংখ্যা বেড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৯ সালের প্রথম ১০ মাসের তুলনায় ২০২০ সালের প্রথম ১০ মাসে বাল্যবিয়ে বেড়েছে ৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে ২০১৯ সালের তুলনায় ৭২% শতাংশ বেশি বাল্যবিয়ে বন্ধ করাও সম্ভব হয়েছে। অন্যথায় বাল্যবিয়ের সংখ্যাটা আরও বেড়ে যেত।

চলমান কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে বাল্যবিয়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শিশু এবং পরিবারগুলো যখন স্কুল বন্ধ হওয়া, আয় কমে যাওয়া এবং ঘরে বেড়ে যাওয়া চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, তখনই বাল্যবিয়ের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) যে স্কুলগুলো নিরাপদ, সেগুলো পুনরায় খোলার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে এটি তার অন্যতম কারণ। এমনকি সাধারণ সময়েও অবিবাহিত মেয়েদের তুলনায় বিবাহিত মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ছিটকে যাওয়ার ঝুঁকি চারগুণের বেশি।

পৃথিবীর যে কটি দেশ বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুসারে বাল্যবিবাহ বলতে বোঝায় বাল্যকালে বা নাবালক বয়সে ছেলেমেয়ের মধ্যে বিয়ে। বাংলাদেশে ১ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত হলো শিশুকাল। তাই ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হলে তাকে বাল্যবিবাহ বলে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের বিয়ের আইন অনুযায়ী পুরুষদের জন্য ২১ বছর এবং নারীদের জন্য ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে যে-কোনো একজনের ১৮ বছরের নিচে বিবাহ হলে তা বাল্যবিবাহ হবে। তবে সাম্প্রতিক আইনে কিছু বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে এটাকে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রেক্ষাপটে কম বয়সে ছেলেমেয়েদের বিয়ের বিধান রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

বাল্যবিবাহের যে সমস্ত কারণ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দরিদ্রতা, অশিক্ষা, সচেতনতার অভাব, প্রচলিত প্রথা ও কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, যৌন নিপীড়ন, মেয়েশিশুর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তার অভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, যৌতুক প্রথা এবং বাল্যবিবাহ রোধসংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। বাল্যবিবাহের কারণে অপরিণত বয়সে সন্তান ধারণ, মাতৃমৃত্যুর হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যহানি, তালাক, পতিতাবৃত্তি, অপরিপক্ব সন্তান প্রসবসহ নানাবিধ জটিলতার শিকার হচ্ছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমাদের দেশে বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১২ থেকে ১৮ বয়সের মধ্যে। বিয়ের ১৩ মাসের মধ্যেই ৬৫% মেয়ে সন্তান ধারণ করে। গ্রামের মেয়েদের বেশিরভাগই বিয়ের এক বছরের মধ্যে সন্তান জন্ম দেয়। বাল্যবিবাহের প্রবনতা ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বাল্যবিবাহের ফলে মেয়েদের অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ করতে হয়। এমনকি গর্ভধারণ থেকে বাচ্চা প্রসব করতেই অনেকের মৃত্যু হয়। প্রতিদিনের খবরের কাগজে চোখ বুলালে এরকম হাজারো ঘটনা চোখে পড়ে। এই বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য কি ক্ষতি করে তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। বাল্যবিয়ের শিকার ভুক্তভোগী ছেলে মেয়ে বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, সে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার নিরিখে এটা মেনে নিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীসময়ে নেতিবাচক ফলাফল সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই থাকে না।

১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ আইন ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে রূপান্তরিত হয়। ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহ আইন সংশোধন করা হলেও এখনো গ্রামগঞ্জে-মফস্বল এলাকাসহ সারা দেশে বাল্যবিবাহ হচ্ছে অহরহ। এ আইনে বাল্যবিবাহের সংজ্ঞায় ছেলেমেয়ের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত বয়সের নিচে পক্ষদ্বয়ের যে-কোনো একজন হলেই সেটি বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে তিন ধরনের বিয়ে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে-১. প্রাপ্তবয়স্কের সাথে অপ্রাপ্ত বয়স্কের বিবাহ, ২. অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের বিবাহ সম্পন্ন, ৩. অপ্রাপ্তবয়স্কের মাতা-পিতা অভিভাবক কর্তৃক বিবাহ নির্ধারণ অথবা এক রকম বিবাহে সম্মতিদান এবং যারা এসব অপরাধে অপরাধী হবেন।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল বা ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই বাল্যবিয়ের প্রচলন এখনো সবচেয়ে বেশি, যা বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যেও রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের প্রবণতা ১৯৭০ সালের তুলনায় ৯০ শতাংশেরও বেশি কমেছে, তা সত্ত্বেও এখনো এই হার অনেক বেশি। বর্তমানে ২০-২৪ বছর বয়সি নারীদের ৫১ শতাংশের বিয়ে হয়েছে তারা শিশু থাকা অবস্থাতেই। এটি এই দেশকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ‘শিশু কনের’ দেশে পরিণত করেছে, যাদের বিয়ে হয়েছে তাদের ১৮তম জন্মদিনের আগেই। আবার এদের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ নারীর বিয়ে হয়েছে তাদের বয়স ১৫ বছর হওয়ার আগেই।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে বন্ধে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, বাল্যবিয়ে বন্ধ করা বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ উভয়েরই একটি অগ্রাধিকার। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশে আরো পরিবর্তন আনতে প্রচেষ্টা প্রয়োজন। জাতীয় লক্ষ্য পূরণের জন্য বাল্যবিয়ে বন্ধের হারে অগ্রগতি গত দশকের তুলনায় কমপক্ষে ৮ গুণ এবং এসডিজির লক্ষ্য পূরণের জন্য ১৭ গুণ দ্রুততর করতে হবে।

ইউনিসেফের মতে, একসঙ্গে অবশ্যই ক্ষতিকর রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে এবং বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে। মানবাধিকারের এই লঙ্ঘন ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনছে, যা শিশুদের কাছ থেকে তাদের শৈশব ছিনিয়ে নিচ্ছে এবং নিজের পছন্দের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে। মেয়েদের বেঁচে থাকা ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে এবং তাদের সহিংসতা ও নিগ্রহের শিকার হওয়া কমাতে এখনই সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বিনিয়োগ করতে হবে। মেয়েদের স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন বিকল্প থেকে নিজের পছন্দের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। প্রথাগত এবং ডিজিটাল উভয় প্ল্যাটফরমে কিশোরীদের প্রতিনিধিত্ব ও দাবি-দাওয়া তুলে ধরার মাধ্যমে ইউনিসেফ তাদের ক্ষমতায়নেও কাজ করে।

অ্যাডভান্স ফ্যামিলি প্ল্যানিং (এএফপি) মিডিয়া অ্যাডভোকেসির তথ্যমতে, করোনা মহামারীতে গ্রাম ও শহর সব জায়গার মানুষ বলতে গেলে ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটিয়েছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলছে গোপনে বাল্যবিয়ের আয়োজন। করোনাকালীন আর্থিক সংকটের কারণে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের কিশোরী মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় বন্ধ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত সেবা না দেওয়ার কারণে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিও সংগঠনের কার্যক্রমও পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও কার্যকরভাবে বাল্যবিবাহ রোধ করা যাচ্ছে না। অনেকে অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলে মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে বাল্যবিবাহ রেজিস্ট্রেশন করছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে দরিদ্রতা কিংবা যৌন নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে তারা বাস্তবতার নিরিখে এসব করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে এটাকে সামাজিক বাস্তবতার সাথে তুলনা করছেন। বাল্যবিবাহ রোধে সর্বপ্রথম দরকার পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অগ্রসর ভূমিকা। সবার সম্মিলিত প্রয়াসই কেবল রুখে দিতে পারে বাল্যবিবাহের এই বিপজ্জনক ঊর্ধ্বমুখীনতা।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English