মানবজীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের যৌনজীবনকে সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আবদ্ধ করা এবং বন্য পশুর সাদৃশ্য অবস্থা থেকে মানবসমাজকে রক্ষা করা। এই কঠিন সমস্যার লাগাম টেনে এবং জটিল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ইসলাম স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি করেছে এবং এটিকে একটি নিয়ম-পদ্ধতির আওতায় এনেছে। ইসলাম যৌনজীবনকে মেনে নিয়ে এর জন্য যুক্তিসংগত যাবতীয় আইন ও পদ্ধতি তৈরি করেছে এবং বিয়ের মতো একটি কল্যাণকর ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য পরিবার গঠনের উদ্দেশ্যে বিবাহবন্ধন হলো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রথা।
ইসলামে বিবাহ ছাড়া যৌন জীবনযাপনের কোনো সুযোগ নেই। বিবাহ হচ্ছে একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে একজন নারী ও পুরুষ স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। বিবাহ অনেক লোকের উপস্থিতি ও সাক্ষ্য-প্রমাণভিত্তিক একটি উন্মুক্ত ঘোষণা, যার মাধ্যমে নারী-পুরুষ নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ও দায়িত্ব বরণ করে নেয়। মানব সৃষ্টির শুরু থেকে ইসলামের এই বিধান চালু ছিল এবং এখনো একই বিধান কার্যকর আছে। বিবাহ পদ্ধতির বিধান দিয়েই ইসলাম ছেড়ে দেয়নি, বরং কাকে বিয়ে করা বৈধ বা হালাল, কাকে বিয়ে করা অবৈধ বা নিষিদ্ধ তারও একটা তালিকা ঘোষণা করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদের, তোমাদের মেয়েদের, তোমাদের বোনদের, তোমাদের ফুফুদের, তোমাদের খালাদের, ভাতিজিদের, ভাগ্নিদের, তোমাদের সেসব মাতাকে যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদের, তোমাদের শাশুড়িদের, তোমরা যেসব স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছ সেসব স্ত্রীর অন্য স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদের, আর যদি তোমরা তাদের সঙ্গে মিলিত না হয়ে থাকো, তাহলে তোমাদের ওপর কোনো পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদের এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা (তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে)।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ২৩)
বিবাহের বিধান দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বিবাহের শর্তও বাতলে দিয়েছে ইসলাম। বিবাহের শর্ত দুটি—ইজাব ও কবুল। বিবাহের পক্ষদ্বয়, নারী ও পুরুষের বা তাদের অভিভাবক অথবা প্রতিনিধিদের ইজাব-কবুলের মাধ্যমে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। ইজাব অথবা কবুল যেকোনো পক্ষ থেকে হতে পারে। ইজাব-কবুল মৌখিক অথবা লিখিত আকারে হতে পারে। ইজাব-কবুলের শর্তাবলি সুস্পষ্ট অর্থজ্ঞাপক হতে হবে। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য পাত্র ও পাত্রীকে (১) মুসলমান, বালিগ ও বুদ্ধিজ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। (২) তাদের স্বেচ্ছাসম্মতিতে বিবাহ অনুষ্ঠিত হতে হবে এবং ইজাব-কবুল নিজ কানে শুনতে হবে। তবে অভিভাবক বা প্রতিনিধির মাধ্যমে বিবাহ অনুষ্ঠিত হলে তা নিজ কানে শোনা আবশ্যক নয়। (৩) বিবাহের অন্তত দুজন বালিগ ও বুদ্ধিমান মুসলিম পুরুষ অথবা একজন বালিগ ও বুদ্ধিসম্পন্ন মুসলিম পুরুষ এবং দুজন বালিগা ও বুদ্ধিসম্পন্ন মুসলিম নারীকে সাক্ষী থাকতে হবে। বিবাহের এই শর্তগুলো মানার পরও অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেনমোহর। বিবাহবন্ধন উপলক্ষে স্বামী বাধ্যতামূলকভাবে স্ত্রীকে নগদ অর্থ, সোনা-রুপা বা স্থাবর সম্পত্তির আকারে যে মাল প্রদান করে তাকে মোহর বলে। দেনমোহর প্রদান স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক কর্তব্য। এটি স্ত্রীর অধিকার। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নারীদের তাদের মোহর প্রদান করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪)
মোহরের পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘১০ দিরহামের কম মোহর হতে পারে না।’ (দারা কুতনি, সূত্র : হিদায়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৪)
এভাবে ইসলামী শরিয়া নানা শর্ত ও আইনের আওতায় বিবাহকে সামাজিক সুরক্ষার একটি বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সব ধরনের যৌন অনাচারকে বিবাহের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিবাহই হচ্ছে একজন মানুষের সুশৃঙ্খল যৌন জীবনযাপনের একমাত্র হাতিয়ার। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন চান, বৈবাহিক জীবনযাপনের মাধ্যমে মানুষ তার দৈহিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করবে। প্রশান্তচিত্তে সে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত থেকে একটি সুন্দর সমাজ গঠনে যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে। এভাবে সমাজ হয়ে উঠবে সুন্দর ও কল্যাণের মহিমায় ভাস্বর।