‘বিবেক’ মানুষের এক মূল্যবান সম্পদ। মানুষের মৌলিক মানবীয় প্রাণশক্তিই হলো ‘বিবেক’। এটি ছাড়া কেউ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে পারে না। সে পশুর কাতারে নেমে আসে। সব মানুষই বিবেকসম্পন্ন। কিন্তু মানুষের শরীর-স্বাস্থ্যের মতো বিবেকের যতœ করতে হয়। সমাজে কেউ কেউ এর নিয়মিত পরিচর্চা করেন আবার অনেকেই অবহেলা ভরে বিবেককে মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দেয়। বিবেকের পরিচর্চার মাধ্যমেই মানুষ ভালো মানুষে পরিণত হয়। সুস্থ বিবেকে বলিয়ান মানুষ আবেগ-উচ্ছ্বাস এবং সব ধরনের লোভ-লালসা নিয়মের মধ্যে বেধে নিতে পারে।
মানুষের নফস বলে একটি কথা আছে, যে সব সময় মানুষকে কামনা-বাসনায় লিপ্ত করতে চায়। অব্যাহতভাবে মানুষকে মায়াবী পৃথিবীর রঙিন জালে আবদ্ধ রাখতে চায়। এই নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিবেকের সাহায্য প্রয়োজন হয়। তাই নফস থেকে বিবেক অবশ্যই অধিকতর শক্তিশালী হতে হবে। এ জন্য বিবেকের নিয়মিত পরিচর্চার প্রয়োজন হয়। বিবেক যত শক্তিশালী হবে নৈতিক মান তত উন্নত হবে। নৈতিক মান যত উন্নত হবে নফস তত দুর্বল হতে থাকবে এবং একসময় নফস বিবেকের গোলামি করতে বাধ্য হবে। কিন্তু যদি এই বিবেককে ক্রমাগত অবহেলা করা হয় তবে এটি অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে যায় এবং একসময় তার অপমৃত্যু ঘটে। তখন মানুষ অমানুষে পরিণত হয়। সমাজ ও সভ্যতায় নেমে আসে অরাজকতা ও বিপর্যয় এবং সমাজ পরিণত হয় অন্যায় ও অবিচারের অভয়ারণ্য।
সব মানুষ জানে বিবেকের গুরুত্ব কতটুকু। কিন্তু তার পরিচর্চা করতে জানে না অথবা এর পরিবেশও পায় না। আমাদের সমাজে কেউ ছোট্ট একটি অপরাধ করলে, মানুষ তাকে বলে থাকে ‘লোকটির বিবেক নেই’ অথবা ‘এটি বিবেকহীনের কাজ’। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষ ও পশুর মধ্যে তফাৎ করা হয় ‘বিবেক’-এর মাধ্যমে। অর্থাৎ মানুষের বিবেক আছে, পশুর নেই। কিন্তু এখানে এ-ও মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষ যখন বিবেকহীন হয়ে পড়ে তখন তার মান পশুর চেয়েও অধিকতর নিচে নেমে আসে। কারণ পশুরা শুধু নিজের জঠরজ্বালা নিবারণের জন্য অন্য পশুকে শিকার করে। হিংসা-বিদ্বেষ, প্রভাব-প্রতিপত্তি বা হিংসাত্মক মনোভাব চরিতার্থ করার জন্য কোনো পশু অন্য পশুর ওপর হামলে পড়ে না। কিন্তু বিবেকহীন মানুষ এমন হীনতর কাজ নেই যা করতে পারে না। যেকোনো জায়গায় সামাজিক বিপর্যয় ঘটানোর জন্য গুটিকয় বিবেকহীন ব্যক্তিই যথেষ্ট।
আমাদের সমাজে বিবেকের মৃত্যুহার দিন দিন বেড়ে চলেছে। কিন্তু কেন? কেন সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ উঠে যাচ্ছে এবং কেন আজ সামাজিক বন্ধন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে? সমাজের সর্বস্তর থেকে আজ ধৈর্য, সহনশীলতা, সহিষ্ণুতা, সহাবস্থান, পরশ্রীমুখরতা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে মানছে না। ছোট বড়কে সম্মান করছে না, বড় ছোটকে স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারছে না। শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছেন ছাত্রের দ্বারা। ছাত্র তার ছাত্র বন্ধুর হাতে নিহত হচ্ছে। সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে যত্রতত্রভাবে। হত্যা, মাস্তানি ও চাঁদাবাজির কারণে সমাজের হা-হুতাশ শুরু হয়েছে। চারদিকে শুধু অবক্ষয় আর অবক্ষয়। ব্যক্তি ও জাতীয় চরিত্রের অধঃপতন, পারিবারিক ও সামাজিক অবকাঠামোর ভাঙন, সামাজিক ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা দেশকে অগ্নিগর্ভে রূপান্তরিত করেছে।
মোট কথা, মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জীবন আজ মরণব্যাধি রোগে আক্রান্ত। তাহলে কি পৃথিবী বিবেকহীনদের ভার সইতে পারছে না? হ্যাঁ, বিবেকের নিয়মিত পরিচর্চা না করার কারণেই বিবেকের মৃত্যুহার বেড়ে গেছে।
আমার ধারণা, আমাদের নেতৃত্বের কারণে বিবেকের এ মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ নেতৃত্বের মনোভাব ও আচার-আচরণ সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ নাগরিকদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করে থাকে। নেতৃত্ব যদি ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন হয়, দেশের জনগণ সর্বক্ষেত্রে ইতিবাচক হবে। একটি দেশের উন্নতির জন্য ‘ইতিবাচক মনোভাব’ সর্বোচ্চ গুরুত্বের দাবি রাখে। নেতিবাচক মনোভাব ও আচার-আচরণ দিয়ে উন্নতির চিন্তা করা যায় না এবং এ ধরনের মনোভাব দিয়ে মানুষের চরিত্র গঠন করাও সম্ভব নয়। বরং নেতিবাচক আচরণ সমাজের সর্বস্তরে অসহিষ্ণুতা, অসৌজন্যতা ও উগ্রতাকে এমনভাবে উসকে দেয় যে, সভ্যতা ও মানুষের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
বিবেক রক্ষা করার জন্য প্রথমত নৈতিক শিক্ষার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য নেতৃত্বের অসুস্থ বিবেককে সর্বপ্রথম সুস্থ করে তুলতে হবে। বিবেকের যেই করুণ ও মুমূর্ষু অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে সম্মিলিতভাবে নেতৃত্ব ও দেশের জনগণের বিবেকের পরিচর্চার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তবে নেতৃত্বের বিবেক যদি আগে সুস্থ হয়ে উঠে তবে সাধারণের বিবেক এমনি এমনি সুস্থ হয়ে উঠবে। তাই মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে তাদের অসুস্থ বিবেককে সুস্থ করে তুলতে হবে। নেতৃত্বের বিবেক যদি সুস্থ হয়ে উঠে, তবে তাদের এই আন্তরিকতার বদৌলতে সারা দেশের বিবেক অনেকটা জেগে উঠবে। অবশিষ্টের জন্য বিবেক পরিচর্চার যেই প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, সেই সব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের উন্নয়ন করতে হবে। এ সব প্রতিষ্ঠান থেকে নৈরাজ্য দূর করে বিবেকবানদের দায়িত্ব দিতে হবে। এমন সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে যার মাধ্যমে বিবেক সুস্থ ও সবল হয়ে জেগে উঠবে।
দায়িত্বশীলতার পবিত্র আমানত রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব থেকে কেউ নিষ্কৃতি পেতে পারে না। প্রত্যেকটি মানুষ যদি তার পরিবার ও সমাজ থেকে দায়িত্বানুভূতির শিক্ষা পায়, তবে সমাজ সুন্দর হয়ে যাবে। সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের পরিবেশ সমাজ ও সভ্যতাকে ফুলে-ফলে সুশোভিত করে তুলবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতিটি মানুষ নিজেদের কর্তব্যবোধ গণ্য করবে। মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে।
সমাজের দুষ্কৃতকারীরাও একদিন বিবেকবান মানুষে পরিণত হবে। বিবেকে জেগে উঠবে। হারানো সেই সমাজে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় মানুষ।