শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন

বেড-আইসিইউ খালি নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল, ২০২১
  • ৬৫ জন নিউজটি পড়েছেন
বেড-আইসিইউ খালি নেই

ঢাকার হাসপাতাল ও আইসিইউতে রোগী ভর্তির জায়গা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, গত ২০ দিন থেকে করোনা সংক্রমণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা অশনি সংকেত।

যে হারে সংক্রমণ এবং রোগী বাড়ছে সারা শহরকে হাসপাতাল বানালেও রোগীর জায়গা হবে না। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে আরো কিছু বেড ও আইসিইউ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি করোনা সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সারা শহরকে হাসপাতাল বানালেও জায়গা হবে না! অবশ্যই এর প্রমাণও মিলেছে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে। কোনো হাসপাতালে রোগী ভর্তি করার জায়গা নেই। চলতি মাসের শুরু থেকেই করোনা সংক্রমণে গতি ছুটছে ‘পাগলা ঘোড়া’র মতো। কোনো ভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না এই গতির। উল্টো গরমের প্রকোপ যতই বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর গতি ততই ঊর্ধ্বগতির দিকে যাচ্ছে।

২ শতাংশে নেমে আসা শনাক্তের হার এখন ২০ শতাংশে ঠেকেছে। গেল ৩ দিন থেকেই ২০২০ সালের সকল রেকর্ড ভেঙে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রতিদিন শনাক্ত হচ্ছেন। ধারণার বাইরে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সংক্রমণ ছাড়িয়ে পড়ায় উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ফের করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। সেই চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতালেই দেখা দিয়েছে বেড সংকট। সিট খালি না থাকায় অনেক হাসপাতালেই নতুন রোগী ভর্তি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এ ছাড়াও এখন যারা সংক্রমিত হচ্ছেন তাদের সঙ্গে সঙ্গেই শারীরিক পরিস্থিতি অবনতি দেখা দিচ্ছে। তরুণ থেকে বয়োবৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের মধ্যে অধিকাংশেরই তীব্র শাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে দ্রুত তাদের আইসিইউতে নিতে হচ্ছে কিংবা হাইফ্লো অক্সিজেন দিতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধরণা করছেন, সম্প্রতি দেশে নতুন ধরনের করোনা (যুক্তরাজ্য ও আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া নতুন করোনা) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে উপসর্গ না থাকলেও অস্বাভাবিকভাবে রোগী বাড়ছে। গরমের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে ধারণা তাদের।

বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এমএ মুবিন খান বলেন, করোনার নতুন ধরন একটু ভিন্ন। আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। নতুন ধরনের কারো ক্ষেত্রে ফুসফুস, আবার কারো গ্যাস্ট্রো-এন্টারোলজিক্যাল সিস্টেমগুলো মারাত্মকভাবে সংক্রমিত হয়। তখন দ্রুততম সময়ে চিকিৎসার আওতায় নেয়া প্রয়োজন হয়। এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশকেই আইসিইউতে নিতে হচ্ছে। এই কারণে এখনই পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এ জন্য সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড বাড়ানোর প্রয়োজন।

করোনায় আক্রান্ত অনেক রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতালগুলো সাধারণ সিট পাওয়া নিয়েই দেখা দিয়েচ্ছে হাকাকার আর আইসিইউ পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, আইসিইউ সংকটের কারণে অনেক ভিআইপি লবিং করেও আইসিইউ পাচ্ছেন না।

খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত রাজধানীর ১০ সরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৫১১টি সাধারণ আসনের মধ্যে ২ হাজার ২৪৬টি আসনেই ছিলেন রোগী ভর্তি। সাধারণ আসন ফাঁকা ছিল মাত্র ২৬৫টি। আর ১০৮টি আইসিইউর মধ্যে ফাঁকা ছিল মাত্র ৫টি।

অন্যদিকে ঢাকার ৯টি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালে ৯২৮টি সাধারণ আসনের মধ্যে ৫৪৭টি আসনেই ছিল রোগী ভর্তি। ফাঁকা ছিল মাত্র ৩৮১টি। আর ১৮৮টি আইসিইউ আসনের মধ্যে ফাঁকা ছিল মাত্র ৪৫টি।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪টি সরকারি ও ৩ টি বেসরকারি মিলিয়ে ৭টি করোনায় বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এগুলোতে ৬৬৭টি সাধারণ আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনেই রোগী ভর্তি রয়েছে। ফাঁকা রয়েছে ৩৬৯টি। আর ৫১টি আইসিইউ আসনের মধ্যে ২১টি আসন ফাঁকা রয়েছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে সারাদেশে ৫ হাজার ৮০৫টি সাধারণ আসনের মধ্যে ৮৮১টি আসনে রোগী ভর্তি রয়েছে। ফাঁকা আছে ৪ হাজার ৯২৪টি আসন। আর ২৩১টি আইসিইউ আসনের মধ্যে ফাঁকা ছিল ১৩১টি আসন।

বুধবার সন্ধ্যায় প্রাইভেট মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ঢাকার ৫টি সরকারি হাসপাতালে সিট ও আইসিইউ বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে আরো ১ হাজার ৫০০ বেড বাড়ানোর অনুরোধ করছি। সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট ৪ হাজার বেড বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন রোগীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু ঢাকার হাসপাতালে বিড় না করে ঢাকার আশপাশের হাসপাতালগুলোতে যাওয়ার জন্য। এখন দেশের সব জেলা সদর হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।

এদিকে দেশে করোনা দেখা দেয়ার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। যার ফলে ঢাকাকে করোনার ‘হটস্পট’ হিসেবে ধরা হয়। তবে এবার ঢাকাসহ আরো ৩১ জেলাকে সর্বোচ্চ সংক্রমিত জেলা হিসেবে আলাদা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

অন্যদিকে করোনা মোকাবিলায় গত বছরের মতো এবারো বেশ কিছু প্রদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার থেকেই সরকার নির্দেশিত ১৮ সিদ্ধান্ত পর্যায়ক্রমে এসব প্রদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দায়িত্বশীল কর্তারা জানিয়েছেন, করোনা মোকাবিলায় গত এক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া আছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে কোনো ঘাটতি নেই। তবে করোনা মোকাবিলায় প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ বেশি প্রয়োজন। তাই সবাইকে সতর্কতার সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর হতেও তারা পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই অর্ধেক করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন।

শনাক্তের নতুন রেকর্ড, সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু: গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন আরো পাঁচ হাজার ৩৫৮ জন। করোনাকালে বাংলাদেশে এটাই একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। এদের নিয়ে দেশে করোনায় সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হলেন ছয় লাখ ১১ হাজার ২৯৫ জন। এই একদিনে মারা গেছেন ৫২ জন। এদের নিয়ে সরকারি হিসাবে মারা গেলেন মোট ৯ হাজার ৪৬ জন।

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, গত ২৯ মার্চ করোনাকালের সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড হয় বাংলাদেশে। সেদিন একদিনে শনাক্ত হন পাঁচ হাজার ১৮১ জন। গতকাল ৩০ মার্চ শনাক্ত হন পাঁচ হাজার ৪২ জন। এ নিয়ে দেশে তৃতীয় দিনের মতো টানা শনাক্ত পাঁচ হাজারের ওপরে। এর আগে গত বছরের ২৬ আগস্ট মারা যান ৫৪ জন। সে হিসাবে গত সাত মাসের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর খবর জানালো স্বাস্থ্য অধিদফতর। গত একদিনে সুস্থ হয়েছেন দুই হাজার ২১৯ জন। তাদের নিয়ে দেশে করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৩৯৯ জন।

৩১ জেলায় করোনার উচ্চ সংক্রমণ: দেশে করোনার উচ্চ সংক্রমণ দেখা দিয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ ৩১ জেলায়। উচ্চ সংক্রমণযুক্ত জেলাগুলো হচ্ছে মৌলভীবাজার, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঢাকা, সিলেট, নরসিংদী, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, বগুড়া, নড়াইল, নীলফামারী, গাজীপুর, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, মাদারীপুর, নওগাঁ, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, নাটোর, টাঙ্গাইল ও কক্সবাজার। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতর ২৯ জেলায় উচ্চ সংক্রমণের কথা জানিয়েছিল। দুই দিনের মধ্যে আরো দুই জেলায় উচ্চ সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English