চুপসে থাকা পিতা এখন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, স্বপন, তুমি কি মজা করছ? তুমি কী করে বলছ মাটির একটি মূর্তি খাবার খাবে আর আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবে? তোমার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছি না স্বপন!
সদ্য পণ্ডিত স্বপন কুমার বললেন, আপনার কথা অনুযায়ী যদি ভগবান উত্তর দিতে অক্ষম হয় তবে কী মাটির তৈরি এ স্রষ্টাপূজা বৃথা নয় হে পিতা? স্বপন কুমারের কথা শেষ হতে না হতেই হইচই পড়ে গেছে সবার মধ্যে, পণ্ডিত হয়ে এ কি অধর্মের কথা মুখে উচ্চারণ করছে স্বপন কুমার। এ কথা, সে কথা, কত কথা সবার! স্বপন কুমার আরো কিছু কথা যোগ করল এ সুযোগেÑ ‘আমি বেদের পণ্ডিত, তাই বেদ সম্পর্কে আমার চেয়ে ভালো আপনারা জানেন না, বেদের মধ্যে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ রয়েছে, সৃষ্টিকর্তা একজন, আর আমরা যেভাবে সৃষ্টিকর্তার আকার তৈরি করি, পূজা করি সেভাবে তিনি প্রকাশিত নয়।’ স্বপন কুমারের এ কথাগুলো তার অস্থির অতৃপ্ত হৃদয়ের কিছু গুপ্ত উক্তিরই প্রকাশ ছিল মাত্র।
সবার সামনে পণ্ডিত ছেলের এমন অধর্মের উক্তিতে অগ্নিশর্মা পিতার ধৈর্যের বাঁধ যেন ছিন্নভিন্ন। এইবার রাগে টেনেহিঁচড়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে উত্তম মধ্যম দিলেন তার পিঠে। পিতা যখন ঘর্মাক্ত দেহ তখন শিথিল হলো বেতের চলমান আঘাত। মমতাময়ী মায়ের দৌড়ঝাঁপ ছেলের অচল দেহ সচল করার সেবায়। সুউচ্চ ব্রাহ্মণ পরিবারের বউয়ের চোখে আজ বাঁধহীন অশ্রু। এ যেন কৃষকের আবাদি ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিতাপ, হয়তো এর চেয়েও বেশি কিছু। মা যে, সন্তানের দুঃখের জন্য মায়ের মনের অবস্থার নিরূপণ কি কোনো শব্দেগুচ্ছে সম্ভব?
অতঃপর, কেটে গেল কয়েক দিন। গ্রামের উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্ত এবার সবার এক দাবিÑ নব্য পণ্ডিতের মুখে ধর্মগ্রন্থের বাণী শুনবে তারা। পণ্ডিত ও যেন এ সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। বাড়ির মন্দিরের সামনে স্বপন কুমার দণ্ডায়মান। বলতে শুরু করলেন তিনিÑ একটি গ্রামের চেয়ারম্যান যেমন দু’জন হতে পারেন না, একটি দেশের প্রধান যেমন দু’জন হতে পারেন না, ঠিক তেমনি করে সার্বিক আধিপত্য বিস্তারকারী নিয়ন্ত্রক দু’জন হতে পারেন না। তিনি একক, তাঁর আকার নেই, অদৃশ্যে ব্যাপ্তি তাঁর, আমরা তাঁকে যেভাবে আকার প্রদান করি তিনি সেভাবে প্রকাশিত নন। স্রষ্টা অবশ্যই হবেন তিনি যিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
এদিকে সবার প্রশ্নÑ এ কি বলছে এ পণ্ডিত? পণ্ডিতরা তো অধর্মের কথা বলে না, বলে তো ধর্মের কথা, এ পণ্ডিতের ভাষায় এ কি ধরনের নিচ কথা বের হচ্ছে। এ তো শোনাও পাপ। অভিযোগ সাথে সাথে বাতাসের মতোন চলে গেল নগেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির কাছে। ছেলের কথা আর আচরণে বিগত কয়েক দিন যাবৎ এমনিতেই তিনি ছিলেন বিরক্ত। আর সেদিন এত আঘাতের পরও আজ তার মুখে এসব কথা আবার। এ তো বাড়াবাড়িতে পরিণত হয়েছে। নাহ্ আর সহ্য করা যায় না। প্রয়োজনীয় কাজে বাড়ির বাইরে থাকা মানুষটি দ্রুত বাড়ি ফিরলেন। স্বপন কুমারের বড় দুই ভাই পিতার রাগান্বিত অবস্থায় আরো পেট্রল ঢালল যেন। এরপর সবাই মিলে পণ্ডিতকে বন্দী করল ঘরের ভেতর। এরপর রক্তের মানুষজন অবর্ণনীয় মারপিট নির্যাতন চালাল স্বপন কুমারের ওপর। পিতা-ভাইদের অত্যাচারের পরও স্বপন কুমারের হৃদয় আকাশে নূর জ্বলতে শুরু করল। অন্য দিকে ব্রাহ্মণ বংশের কঠোরতা এমন হলো তারা স্বপন কুমারকে নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত হলোÑ স্বপন কুমারের মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটাতে হবে। ওই চিন্তা থেকে স্বপন কুমারের মাথায় কাচের আঘাত করা হলো দফায় দফায়।
স্বপন কুমারকে দণ্ড দিতে দিতে যখন তার দেহ নিথর তখন তাকে মেঝেতে ফেলে সবাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে গৃহ ত্যাগ করল। মমতাময়ী মা তাৎক্ষণিক সবার অলক্ষ্যে স্বপন কুমারকে মুক্ত করতে ঘরে ঢোকেন এবং নিজ হাতে দড়ি খুলে দেন। ঘণ্টাখানেক পর মমতাময়ী মা দরদ মাখা কণ্ঠে বললেন, স্বপন কলিজার টুকরা আমার, তোমার চিন্তায় যিনি স্রষ্টা, আমি প্রার্থনা করি তিনি তোমায় রক্ষা করুন এবং সঠিক পথের নির্দেশনা দিন। অতঃপর আধমরা শরীরের স্বপন কুমারকে মা একটি থলে দিলেন এবং বললেন চলে যাও বাবা, দূরে চলে যাও। এ স্থান, এ রক্তের আত্মীয় তোমার জন্য নিরাপদ নয়। তোমার মতে স্রষ্টা যিনি তিনি তোমায় রক্ষা করুন, আমি তোমাকে সে পথেই দিয়ে দিলাম। ভারাক্রান্ত জীর্ণশীর্ণ স্বপন যখন বাড়ির পথ পেরিয়ে নদী অতিক্রমরত, ঠিক তখন আপন বড় ভাইয়ের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয় অসহায় স্বপন কুমার। স্বপন কুমার অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছেন। তাকে বস্তায় বন্দী করে ফেলে দেয়া হয় ধলেশ্বর নদীতে। স্বপন কুমার জানে না নদীতে তার অবস্থানের সময়কাল কতটুকু বা কী করে গভীর নদী থেকে প্রান্তে পৌঁছাল। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন স্বপন কুমারের চর্মচক্ষুতে নূরানী চেহারার একজন মানবমূর্তি, দাড়িগুলো সাদা-কালো এবং সাদাসিধা একটি পাঞ্জাবি পরিহিত লোকটি ক্ষীণ হাসি দিয়ে বললেন, কেমন লাগছে এখন? আমি বাধ্যগত একজন ছাত্রের মতো উত্তর দিলাম বেশ ভালো লাগছে, কিন্তু এখানে আমি?