সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

ভাস্কর্য ও কিছু খোঁড়া যুক্তি

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৪৪ জন নিউজটি পড়েছেন

আমরা জানি ইসলামী শরিয়তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় প্রমাণ হওয়ার জন্য ক্রুআনে কারিম ও রাসূল সা: থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদিসের প্রয়োজন হয়, যা এখানে বিদ্যমান নেই।
তারা আরো একটি দলিল উল্লেখ করেন যে, কুরআনে কারিমের সূরা সাবার ১৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘সুলাইমান আ:-এর অনেকগুলো জিন ছিল, যে জিনরা সুলাইমান আ:-এর নির্দেশ অনুযায়ী অনেক কিছু নির্মাণ করত। তার মধ্যে একটি হলো তামাছি বা আকৃতি জিনরা নির্মাণ করত। এ আয়াত দ্বারা তারা বোঝাতে চান যে সুলাইমান আ: একজন নবী হয়ে তিনি যদি জিনদের দিয়ে আকৃতি বা ভাস্কর্য নির্মাণ করতে পারেন তাহলে আমাদের করতে বাধা কোথায়?
এর তিনটি উত্তর রয়েছে। প্রথমটিÑ আমরা জানি, অন্য নবীদের শরিয়ত এবং আমাদের নবীর শরিয়ত এক নয়। আগের নবীদের যুগে অনেক কিছু জায়েজ ছিল যা আমাদের জন্য জায়েজ নয়। হয়তো সুলাইমান আ:-এর শরিয়তে সেটি জায়েজ ছিল। তাফসিরে কুরতুবিতে অনেক মুফাসসিরের মত হিসেবে এটি উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাথে কুরতুবিতে আরো একটি মত উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি হলোÑ তামাছি অর্থাৎ এখানে যে আকৃতির কথা বলা হয়েছে সেই আকৃতি কোনো মানুষ বা প্রাণীর না হয়ে অন্য কোনো বস্তুর ছবি ছিল। আবার অনেক মুফাসসির বলেছেন, মূলত সেসব পিতল এবং কাঁসার অবয়ব ছিল যেগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে কোনো প্রাণীর আকৃতি বোঝা যায় না। সুতরাং এ ধরনের (অপ্রাণী এবং যাকে শ্রদ্ধা করা হচ্ছে না) আকৃতি রাখা জায়েজ হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা সুলাইমান আ:-এর শরিয়তে কিছু থাকলে এবং সেটি আল্লাহ তায়ালা কুরআনে উল্লেখ করলেই যে তা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হবে তা নয়। বিশেষ করে যদি তার বিপরীতে কুরআনে বা হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকে।
আমাদের সমাজের একটি অদ্ভুত চিত্র হচ্ছেÑ অনেক সময় দেখা যায় যে, কোনো বিষয় নিয়ে যখন বিতর্ক হয় তখন গণমাধ্যমে এমন কিছু লোক ইসলামের ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হন বা ফতোয়া নিয়ে হাজির হন যারা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত নন। তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কিত না হলেও তারা বিতর্কিত সেই বিষয় নিয়ে ইসলামের আলোকে কথা বলা শুরু করেন। এটি সবচেয়ে হাস্যকর। আবার এমন কিছু আলেমকে এসব কথার সপক্ষে দাঁড়াতে দেখা যায় যারা আলেম হিসেবে এ দেশের মানুষের কাছে পরিচিত কেউ নন।
পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম যারা শিরক শুরু করেছে, যারা প্রতিমা পূজা শুরু করেছে তারা হলো নূহ আ:-এর জাতি। এটি শুরু হয়েছে যেভাবে তার ইতিহাস সূরা নূহের ২৩ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। তা হলোÑ তারা নূহ আ:-এর উম্মতের মধ্য থেকে আগেকার নেককার মানুষের আকৃতি নির্মাণ করলো বা মূর্তি বানাল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল; যেন এই নেককার বান্দাদের মূর্তি দেখে তাদের মধ্যে ভালো কাজ করার আগ্রহ জাগে। কারণ মূর্তিগুলো ছিল ভালো মানুষের। দীর্ঘদিন পর্যন্ত মূর্তিগুলোকে পূজা না করেই রাখা হলো। এরপর এক সময় সেই মূর্তিগুলোকে মানুষ শ্রদ্ধাভক্তি করতে করতে সিজদা করা শুরু করে দিলো। এভাবেই পৃথিবীতে প্রতিমার পূজা শুরু হয়।
আজো আমরা দেখি পৃথিবীতে অনেক ভাস্কর্য শুরু হয় প্রথমে সম্মানের জন্য, সৌন্দর্যের জন্য বা চেতনা সঞ্চারিত করার জন্য। এরপর সেখানে ফুল দেয়া হয় তারপর সেখানে নীরবতা পালন করা হয়। একটি সময় হয়তো মানুষ সেখানে মাথা অবনত করে সিজদা করা শুরু করবে। ইসলামী শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলোÑ কোনো অপরাধের দোয়ার উন্মোচিত হতে পারে এরকম পথ বন্ধ করে দিতে হয়। এটিই হচ্ছে শরিয়তের পরিষ্কার নির্দেশনা।
এ ক্ষেত্রে রাসূলে কারিম সা:-এর অনেকগুলো পরিষ্কার হাদিস আমরা পাই। তন্মধ্যে সহিহ মুসলিমের ৯৬৯ নং হাদিস একটি। এখানে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলে কারিম সা: তাঁর প্রিয় সাহাবি আলী রা:কে নির্দেশ করেছেন, তিনি যেন যত প্রকার প্রাণীর ছবি আছে তা মুছে দেন এবং উঁচু কবরগুলোকে সমান করে দেন। এই হাদিসে কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট প্রকারের প্রাণীর কথা বলা হয়নি বরং সব ধরনের প্রাণীর ছবি মুছে ফেলতে বলা হয়েছে।
একইভাবে আবু দাউদে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, একবার জিবরাইল আ: রাসূলে কারিম সা:-এর বাসায় এসে ফিরে গিয়েছেন। পরে এসে জিবরাইল বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার ঘরে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হয়েছি। কারণ আপনার বাসায় বা দরজার সামনে যে পর্দা ছিল তাতে একটি প্রাণীর ছবি বা অবয়ব ছিল। তখন নবী সা: সেই প্রাণীর অবয়বকে বা প্রাণীর মাথার অংশকে মুছে দিলেন। তারপর জিবরাইল সেখানে প্রবেশ করলেন। এই হাদিস থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল যে, পূজা বা অর্চনার উদ্দেশ্যে যদি না হয় এবং শিরক করার উদ্দেশ্যেও না হয় তারপরেও ঘরে প্রাণীর ছবি, প্রতিকৃতি, অবয়ব রাখা জায়েজ নয়। থাকলে সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করতে পারে না।
এছাড়া বুখারি ও মুসলিম একযোগে বর্ণনা করেছে যে, রাসূলে কারিম সা: ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন আজাব দেয়া হবে ওই সব লোকদেরকে যারা ছবি অঙ্কন করেন, যারা ভাস্কর্য নির্মাণ করেন বা যারা মূর্তি প্রস্তুত করেন। (বুখারি : ৬০৬)
বুখারির অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘ওই ঘরে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না যেই ঘরে কোনো কুকুর থাকে অথবা কোনো ছবি বা ভাস্কর্য শো-পিচ বা অন্য কোনোভাবে থাকে। তবে পাহারার জন্য কুকুর রাখলে ভিন্ন কথা। আর বাচ্চাদের খেলার জন্য খেলনা হিসেবে কোনো পুতুল থাকলে সেটি অনেক ওলামায়ে কেরামের মতে জায়েজ রয়েছে। এ ছাড়া আরেকটি হাদিসে রাসূলে আকরাম সা: ইরশাদ করেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করে তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে বলা হবে যে, তুমি তাতে রূহ ফুঁৎকার দাও। কিন্তু সেই ব্যক্তি তখন রূহ দিতে পারবে না এবং তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। (মুসনাদে আহমদ : ৩৩৪৯) এ ছাড়া বহু হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, কোনো প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা বা ভাস্কর্য নির্মাণ করা ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ এবং হারাম। যা নির্মাণ করা অঙ্কন করা হারাম তা প্রদর্শন করা এবং স্থাপন করা অবশ্যই হারাম হবে।
ইমাম নববী রহ: হাফেজ ইবনে হাজার আসকলানী রহ: ফতোয়ায়ে শামীর রচয়িতা ইমাম ইনবে আবেদীন শামী রহ:সহ গোটা বিশ্বের সব বড় বড় স্কলার একমত যে, এটি কোনোরূপেই জায়েজ নয়।
তবে অমুসলিমরা তাদের উপাসনালয়ে প্রতিমা বা মূর্তি স্থাপন করবে তাতে মুসলিমরা তাকে অসম্মান করে কিছু বলবে না বা তাতে বাধা দেবে না। এ বিষয়ে কুরআনুল কারিম ও রাসূলের হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু মুসলিমরা নিজেদের সমাজে বা নিজেদের বাসা বাড়িতে কোনো ভাস্কর্য, কোনো মানুষ বা কোনো প্রাণীর ছবি অঙ্কন করতে যাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রত্যেকের জীবন সব ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদিসের প্রতিটি বিধান অক্ষরে অক্ষরে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English