শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

ভ্যাকসিনের বিশ্ববাজার দখলের লড়াই চলছে

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০
  • ৭২ জন নিউজটি পড়েছেন

বিশ্বে মানুষের এখন একটাই চাওয়া- করোনাভাইরাস নির্মূলে ভ্যাকসিন দ্রুত বাজারে আসুক। তবে ভ্যাকসিন কবে বাজারে আসবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দোলাচল কাটছেই না। কখনও খবর আসছে এ বছরের মধ্যেই ভ্যাকসিন বাজারে আসবে, কখনও বলা হচ্ছে দেড়-দুই বছরের আগে নয়। তবে সব খবর ছাপিয়ে এখন ভ্যাকসিনের বিশ্ববাজার দখলের লড়াইয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান মর্ডানা, যুক্তরাজ্যের অ্যাস্ট্রা জেনেকা ও চীনের ক্যানসিনো। ক্যানসিনোর ভ্যাকসিন এরই মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে চীনের স্বাস্থ্য বিভাগের। প্রয়োগ করা হচ্ছে চীনের সেনা সদস্যদের। এদিকে মর্ডানা ও অ্যাস্ট্রা জেনেকা বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার আরও এক ধাপ এগিয়ে অক্টোবরেই ভ্যাকসিন বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গতকাল বুধবার পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে ১৬৬টি ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রয়োগের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে একটি ভ্যাকসিন, চারটি তৃতীয় স্তরের পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে, ১১টি দ্বিতীয় স্তরে, ১৫টি প্রথম স্তরে এবং ১৩৫টি এখন পর্যন্ত মানব দেহে প্রয়োগের অনুমতি পায়নি।
চীনের ক্যানসিনো বায়োটিক ফার্ম উৎপাদিত ভ্যাকসিন সীমিত পরিসরে দেশটির সেনা সদস্যদের মধ্যে প্রয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এডি৫-এনকভ নামের ভ্যাকসিনটি বিশ্বে প্রথম চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া কভিড-১৯ ভ্যাকসিন। ক্যানসিনোর সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী এই ভ্যাকসিন প্রথম পর্যায়ে যে সেনা সদস্যদের প্রয়োগ করা হয়েছে, তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার পরও সংক্রমিত হননি। তাদের শরীরে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দৃঢ় ও বিস্তৃত অ্যান্টিবডির উপস্থিতিও দেখা গেছে। চীন সরকার পর্যায়ক্রমে আরও সেনা সদস্যদের মাঝে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষের জন্য কবে উন্মুক্ত করা হবে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তৃতীয় স্তরে পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন চারটি :তৃতীয় স্তরে চারটি ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। অর্থাৎ এগুলো মানবদেহে প্রয়োগ সফল হয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ পর্যায়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বায়ো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রা জেনেকা। এরই মধ্যে কোম্পানিটি মানবদেহে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শেষে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য একাধিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে। এ ছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেন সরকারের সঙ্গেও ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে। অ্যাস্ট্রা জেনেকার সর্বশেষ বার্তায় জানানো হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই ভ্যাকসিন বাজারে আনতে প্রস্তুত তারা। এমনকি সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হলে ডিসেম্বরের মধ্যেই এই ভ্যাকসিনের ৭০০ কোটি ইউনিট তৈরিতেও সক্ষম তারা। কিন্তু ভ্যাকসিনটি আরও বেশি মানুষের মধ্যে প্রয়োগের পর এর কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য চায় ব্রিটিশ স্বাস্থ্য দপ্তর। এ কারণে বেশি মাত্রায় প্রয়োগের জন্যই অ্যাস্ট্রা জেনেকার গবেষক দল এখন ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার অধিক সংক্রমিত এলাকায় গণহারে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অ্যাস্ট্রা জেনেকার সঙ্গে পাল্লা দিয় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি মর্ডানা আইএনসি এমআরএনএ-১২৭৩ নামে ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা গত ১০ জুলাই শুরু করেছে। একই সঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্যও কাজ শুরু করেছে মর্ডানা। ক্যাটালেনট কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ১০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছে মর্ডানা।
মর্ডানার এই প্রস্তুতির মুহূর্তে গত ১০ জুলাই চমকপ্রদ খবর জানাল মার্কিন কোম্পানি ফাইজার। ওই দিন ফাইজারের সিইও অ্যালবার্ট বোরলার টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। বোরলা জানান, ফাইজার কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরে সফল পরীক্ষার পর তৃতীয় পর্যায়ে মানবদেহে প্রয়োগ শুরু করেছে। তারা আশাবাদী- সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী অক্টোবরেই ভ্যাকসিন বাজারে আসবে। তিনি বলেন, প্রথম এক মাস ফাইজার শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে চায়। এরপর পর্যায়ক্রমে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাবে।
তৃতীয় স্তরের পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা আরেকটি কোম্পানি সিঙ্গাপুরের ডিউক-এনইউএস মেডিকেল স্কুল। এই প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা সফল টিকা আবিস্কারের পথে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে সিঙ্গাপুরের এই টিকার ধরন অন্য টিকার চেয়ে আলাদা। এটি আগাম প্রয়োগ করা হলে মানবদেহে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যথাযথ ইমিউনিটি বা সক্ষমতা তৈরি করবে, আবার সংক্রমিত রোগীদের দ্রুত সংক্রমণমুক্ত করার চিকিৎসাতেও ব্যবহূত হবে। ডিউক-এনইউএস স্কুলের একজন মুখপাত্র সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই টিকা তারা আগামী মার্চের মধ্যে বাজারে নিয়ে আসতে চান।

অন্যান্য স্তরের অবস্থা :বাংলাদেশ, ভারত, জাপান, জার্মানি, রাশিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের কয়েকটি কোম্পানি ভ্যাকসিন আবিস্কারের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এগুলোর কোনোটিই মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করেনি। বাংলাদেশের কোম্পানি গ্লোব বায়োটেকের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ড. আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, তাদের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন দ্বিতীয় স্তরে পশুর ওপর প্রয়োগ চলছে। ছয় সপ্তাহের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ হলে তারা মানবদেহে প্রয়োগের জন্য এর প্রটোকল বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে জমা দেবেন। একই সঙ্গে তারা মানবদেহে প্রয়োগের জন্য সিআরও (কন্ট্রাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশন) মনোনীত করে নিয়োগের জন্যও আবেদন করবেন। কারণ মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সরাসরি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান করতে পারে না। সিআরও মানবদেহে প্রয়োগের বিষয়ে ফলাফল জানালে চূড়ান্ত অনুমোদন চাওয়া হবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হলে গ্লোব বায়োটেকও চলতি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের বাজারে ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারবে। গ্লোব বায়োটেক বারোটি ক্যান্ডিডেট নিয়ে কাজ করছে, যেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মর্ডানার মতো প্রতিষ্ঠান একটি মাত্র ক্যান্ডিডেট নিয়ে কাজ করছে। ফলে তারা তাদের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন সফলভাবে কাজ করবে বলে দৃঢ় আশাবাদী।
এদিকে ভারতে চলতি মাসেই ভারত বায়োটেক উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন মানবদেহে প্রয়োগ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। এরই মধ্যে মানবদেহে পরীক্ষার জন্য সিআরও অনুমোদন হয়েছে। কোভ্যাকসিন নামের এই ভ্যাকসিন সার্স-কভ-২ ভাইরাসের স্ট্রেন থেকে তৈরি।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English