করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন বানাতে এক রকম প্রতিযোগিতা চলছে। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে একেবারেই নতুন ধরনের গুপ্তচরবৃত্তির খেলা। নতুন এই খেলা আর কিছু নয়, করোনা ভ্যাকসিনের তথ্য চুরি। রীতিমতো গুপ্তচর বনাম গুপ্তচর।
এক দেশের করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন গবেষণার তথ্য হাতিয়ে নিতে গোয়েন্দাগিরিতে নেমেছে আরেক দেশের গুপ্তচর। কে কার আগে ভ্যাকসিন বানাবে, সেই লক্ষ্যে দিনরাত এক করে ফেলছে বিশ্বের তাবড় তাবড় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও।
দেশে দেশে গুপ্তচরবৃত্তি নজরদারির দায়িত্ব পালন করা সাবেক ও বর্তমান গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য উঠে এসেছে। করোনা মহামারী থামাতে একটা মাত্র কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন তৈরির লক্ষ্যে নজিরবিহীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। এক্ষেত্রে রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ আরও কয়েকটি দেশ নেতৃত্বের পর্যায়ে রয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের করোনা ভ্যাকসিনের তথ্য-উপাত্ত চুরির জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীনা হ্যাকাররা। সেই লক্ষ্যে ‘সহজ শিকার’র জন্য ইন্টারনেটে ওঁতপেতে ছিল তারা।
এক্ষেত্রে ফার্মাসিউটিক্যাল তথা ওষুধ কোম্পানিগুলোর পেছনে না ছুটে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা ও ভ্যাকসিন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালাচ্ছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলোকে টার্গেট করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু চীনা হ্যাকাররাই নয়, করোনার ভ্যাকসিনের তথ্য হাতানোর চেষ্টা করছে রাশিয়ার হ্যাকাররাও।
এমনকি রাশিয়ার প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরও যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যাকসিন গবেষণা সেন্টারগুলোকে টার্গেট করেছিল। এছাড়া কানাডা এবং ব্রিটেনও তাদের লক্ষ্য ছিল। রুশ হ্যাকারদের এই গুপ্তচরবৃত্তি প্রথম শনাক্ত করে ও ঠেকিয়ে দেয় ব্রিটেনের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। চলতি বছরের জুলাই মাসে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ভ্যাকসিনের তথ্য হ্যাক করার চেষ্টা করে রাশিয়ার গুপ্তচররা।
এমন অভিযোগ করে ব্রিটেনের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (এনসিএসসি), কানাডিয়ান কমিউনিকেশন সিকিউরিটি এস্টাবলিশমেন্ট (সিএসই), মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস), সাইবার সিকিউরিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি (সিআইএসএ) ও মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ)। সেই সঙ্গে হ্যাকিং নিয়ে সতর্কবার্তাও প্রকাশ করে সংস্থাগুলো।
এনসিএসসি জানায়, হ্যাকিং গ্রুপটি যে রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার অংশ হিসেবে কাজ করছে তা ‘প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিত’। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, করোনা ভ্যাকসিনের তথ্য হাতাতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে ব্যাপক করোনাপীড়িত ইরানও। তবে ভ্যাকসিনের তথ্য যাতে বেহাত না হয়, তার জন্য সব চেষ্টাই করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এরই মধ্যে বিদেশি গুপ্তচরদের থামাতে পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তিতে নেমেছে দেশটির প্রধান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও। এমনকি রুশ গুপ্তচরদের গতিবিধির প্রতি নজর রাখতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর গোয়েন্দারাও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গুপ্তচরদের এ তথ্য চুরির চেষ্টা নতুন করে মহাকাশ জয়ের প্রতিযোগিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ও মহাকাশে নিজেদেরকে সবচেয়ে শক্তিশালী তথা পরাশক্তি প্রমাণ করতে মরিয়া ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ও যুক্তরাষ্ট্র।
আর সেই লক্ষ্যে নিজ নিজ দেশের গুপ্তচর বাহিনীকে কাজে লাগিয়েছিল দেশ দুটি। শীতল যুদ্ধের সময় এই দৌড় পৃথিবীর কক্ষপথ ও চন্দ্র জয়ের ক্ষেত্রে শুরু হয়। করোনার ভ্যাকসিন পেতে ঠিকই একইভাবে গুপ্তচরদের কাজে লাগাচ্ছে দেশগুলো।
চীনের গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপারে গত মাসে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারবিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা জন বলেন, এই মুহূর্তে এ যাবৎকালের সবচেয়ে দামি জৈব গবেষণা কর্মকাণ্ড চলছে।অ