বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০২ অপরাহ্ন

মহামারী ও আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব অবহেলা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০
  • ৭২ জন নিউজটি পড়েছেন

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপ্তি নিয়ে সারা দুনিয়ার মানুষ এখন ভয়ানকভাবে উৎকণ্ঠিত। এ ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টাও হচ্ছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য গবেষণা হচ্ছে। সে জন্য বিশ্ব সংস্থা সক্রিয়। অনেক দেশ সে জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ ডোনেট করছে। এর মধ্যে মার্কিন বায়োটেক কোম্পানির ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালসের গবেষকরা সুখবর শুনিয়েছেন। তারা ভ্যাকসিন আবিষ্কারে উৎসাহব্যঞ্জক সাফল্য পাওয়ার দাবি করে বলেছেন, তাদের ভ্যাকসিন মানবদেহে পরীক্ষা করে দেখা গেছে ৩৬ জনের মধ্যে ৩৪ জনের শরীরে করোনা প্রতিরোধী এন্টিবডি গঠিত হয়েছে। একটু সময়সাপেক্ষ হলেও সে ব্যাপারে আরো সাফল্য লাভের আশা করা হচ্ছে।
আবার ইতোমধ্যে চীনা বিজ্ঞানীরা আরো এক ধরনের ফ্লু ভাইরাসের উপস্থিতির তথ্য জানিয়েছেন এবং সে ভাইরাসও কোভিড-১৯ এর মতো মানবজাতির জন্য ভয়ানক হতে পারে বলেও তারা হুঁশিয়ার করেছেন। জি৪ইএএইচ১এন১ নামের এ ভাইরাস মানুষের শ্বাসযন্ত্রে বেড়ে উঠতে এবং বিস্তার ঘটাতে সক্ষম। এর আগে আমরা এইডস বা এবোলার মতো ভয়ানক রোগেরও মুখোমুখি হয়েছি। এ থেকে আন্দাজ করা যায় পৃথিবী আসলে মানববংশের বসবাসের জন্য বিপজ্জনক স্থানই হয়ে থাকছে।
কেন আমরা এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি? অথচ আল্লাহ তায়ালা খুব ভালোবেসে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তারপর তাদের তার এ দুনিয়ায় বসবাসের জন্য পাঠিয়েছেন। মানুষকে তিনি সর্বোত্তম অবয়ব দান করেছেন। সূরা আত তীনের চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘আমি মানুষকে সর্বোত্তম অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছি।’ এ সুন্দর সৃষ্টি মানুষ দুনিয়ায় যাতে শান্তি ও স্বস্তির সাথে বসবাস করতে পারে তারও উত্তম ব্যবস্থা তিনি করেছেন। মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় সবকিছু রয়েছে এ চরাচরে। এমনকি মানুষের সৌন্দর্য পিপাসা মেটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। আবার সেই আল্লাহই অত্যন্ত মহব্বতের সৃষ্টি মানুষকে মহামারীর দুর্যোগে নিপতিত করছেন।
তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ৩০ নং আয়াতে বলেছেন, ‘তোমাদের রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে চাই। ফেরেশতারা বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে নিযুক্ত করতে চান যারা সেখানকার ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত করবে এবং রক্তপাত করবে?’ প্রতিনিধি শুধু উপভোগের জন্য নয়, সেটার ব্যবস্থাপনাও সুষ্ঠু ও সুন্দর রাখার দায়িত্ব তার। কিন্তু আপসোস মানবজাতি এখন দুনিয়া উপভোগই শুধু করছে, ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা রাখার চেষ্টা বাদ দিয়ে। আর রক্তপাতের কথা তো বলাই বাহুল্য। এর ফল তো আমাদেরই ভুগতে হবে নিঃসন্দেহে। আল্লাহ কুরআনের অন্যত্র বলেছেন, ‘যাহরাল ফাসাদা ফিল বাহরি অল বাররি বিমা কাছাবাত আইদিন নাছ। অর্থাৎ- জলে স্থলে যত অশান্তি সব মানুষের হাতের কামাই।’
স্বয়ং আল্লাহ যে মানুষকে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন তারা দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা নষ্ট করলে আল্লাহ তো নিশ্চুপ থাকতে পারেন না। এখন পর্যন্ত আমরা জানি যে, সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর মধ্যে পৃথিবীকেই আল্লাহ সবচেয়ে সুন্দরতম করে সাজিয়েছেন। তিনি এখানে সৃজন করেছেন হাজারো রকমের বৃক্ষলতাদি, তাতে বিচিত্র বর্ণের ফল-ফুল, অসংখ্য রকমের পশু ও পাখ-পাখালি, নদী ও সাগরে আছে অনুরূপ অসংখ্য মাছ ও প্রাণী এবং আরো কত কিছু। এসব কিছু মানুষ অবলীলায় ধ্বংস করছে। কোনো কিছু ভ্রƒক্ষেপ না করে। এক্ষেত্রে আমাদের মুসলমানদের ভূমিকাও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। এমতাবস্থায় তাঁর এ অত্যন্ত প্রিয় পৃথিবীর শৃঙ্খলা রক্ষায় এখন তাই আল্লাহ রব্বুল আলামিনের হস্তক্ষেপ করাই যুক্তির দাবি।
মনীষী ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি:) তার কালজয়ী গ্রন্থ আল মুকাদ্দিমায় মহামারীর কারণ ও তার ফলাফল নিয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ কথা বলেছেন। গ্রন্থটিতে ‘সাম্রাজ্যের শেষের দিকে জনবসতির প্রাচুর্য এবং অধিকমাত্রায় মহামারী ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়’ শিরোনামে তিনি লেখেন, সাম্রাজ্যের দুর্বলতার জন্য গোলযোগ দেখা দেয় এবং তদ্দরুন অসুবিধা ও হত্যাকাণ্ড দেখা দেয় অথবা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর কারণ সাধারণভাবে জনবসতির আধিক্যের জন্য আবহাওয়া দূষিত হওয়া। কারণ ঘনবসতির জন্য দুর্গন্ধ ও দূষিত আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে জীবাত্মার আহার্য বায়ু বিকৃত হয়ে ওঠে। এরূপ বিকৃতির কারণ স্থায়ী হলে বায়ুর মিশ্রণ বিগড়ে যায়। সুতরাং এরূপ বিকৃতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছলে তা দিয়ে ফুসফুস রোগাক্রান্ত হয়। এর ফলেই ফুসফুস সংক্রান্ত বিভিন্ন মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটে। এমনকি বায়ুর বিকৃতি মারাত্মক পর্যায়ে না পৌঁছলেও তার অন্তর্গত দূষিত উপাদান বৃদ্ধি পেয়ে পরিবেশকে দূষিত করে এবং এর দরুন বিভিন্ন প্রকার জ্বর দেখা দেয়। দেহ রোগাক্রান্ত হয় ও ধ্বংস হয়ে যায়। (গোলাম সামদানি কোরায়শী অনূদিত ও দিব্য প্রকাশ প্রকাশিত প্রথম খণ্ডের ৫১৪ পৃষ্ঠা) তিনি ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা নির্ধারণ করেন’ বাক্যটি লিখে এ আলোচনার শেষ করেছেন।
সুতরাং এসব মহামারী থেকে মানবজাতি কিভাবে পরিত্রাণ পাবে তা কেবল মহামহিম আল্লাহ তায়ালাই জানেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর, যেটা আমরা জানি না, তার ওপর নির্ভর করে চুপ করে বসে থাকব। মানুষ হিসেবে আমাদের অবশ্যই তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা: যেমন বলেছেন, তুমি আগে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো। অবশ্য এসব মহামারীর প্রতিষেধক খোঁজার সাথে সাথে আমাদের যেসব কারণে একের পর এক মারাত্মক রোগ আপতিত হচ্ছে সেগুলো কিভাবে দূর করা যায় তা নিয়েও সক্রিয়ভাবে ভাবতে হবে এবং নিরসনে কাজ করতে হবে। আর মানবজাতিকে বিশেষ করে মুসলমানদের, যারা জানে এ পৃথিবী ও তার পরিবেশের প্রতি মহান আল্লাহ তার কি দায়িত্ব-কর্তব্য ন্যস্ত করেছেন, তা উত্তমভাবে প্রতিপালনে সজাগ হতে হবে। তা না হলে মহামারীর ঢেউ পরপর আমাদের দিকে ধেয়ে আসতেই থাকবে। আল্লাহই সর্বোত্তম হেফাজতকারী।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English