রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন

মাদকাশক্তি বাড়াচ্ছে মাথাব্যথা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪৫ জন নিউজটি পড়েছেন

মাদকাসক্তি বাংলাদেশের একটি অন্যতম সামাজিক সমস্যা। এ দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মাদকাসক্তের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী। আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, আসক্তদের শতকরা ৯০ ভাগ কিশোর-তরুণ। তাঁদের ৪৫ ভাগ বেকার, ৬৫ ভাগ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট। মাদকাসক্তির থাবায় ঝরে যাচ্ছে অনেক সম্ভাবনা, যা বাড়াচ্ছে আমাদের মাথাব্যথা। দেশের মাদক পরিস্থিতি এবং এর সমাধান নিয়ে আলোচনা হলো এসকেএফ নিবেদিত ‘আমাদের যত মাথাব্যথা’র চতুর্থ পর্বে।

অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড এডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ হেলাল।

একটি মানুষের মাদকাসক্ত হওয়ার বহু কারণ থাকে। বংশগতভাবে মাদক গ্রহণের প্রবণতা থাকতে পারে। এ ছাড়া পারিপার্শ্বিক কারণ, শৈশবে তার বিকাশ কেমন হয়েছে, সামাজিক অবস্থানটি কী রকম, তার মানসিক গড়নটি কতটা শক্ত, সে ‘না’ বলতে শিখেছে কি না, পিয়ার প্রেশারকে এড়াতে শিখেছে কি না—এর সবকিছুর ওপর মাদকাসক্তি নির্ভর করে বলে জানান আহমেদ হেলাল। তিনি আরও বলেন, কেউ হতাশা থেকে বা কৌতূহলবশত মাদক গ্রহণ করতে গিয়ে আসক্ত হয়। এমনকি উৎসব উপলক্ষে মাদক গ্রহণ করে এর প্রতি আসক্ত হওয়ার উদাহরণও কিন্তু আছে।

মাদকাসক্তি হলে চিন্তা, ব্যবহার ও আচরণে পরিবর্তন হয়। অনেকে মাদক ব্যবহার করে কিন্তু আসক্ত হন না। মানুষ কীভাবে মাদকাসক্ত হয়, তার জৈবিক বিশ্লেষণ জানা গেল ডা. মেখলা সরকারের আলোচনা থেকে। মাদক ব্যবহার করতে করতে যখন মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক ও স্নায়ুজনিত রাসায়নিক পরিবর্তন হয়, তখন মাদকের ইচ্ছাকৃত ব্যবহারটা বাধ্যগত ব্যবহারে পরিণত হয়। অর্থাৎ একটি মাদক নির্দিষ্ট ডোজে না নিলে যখন শারীরিক বা মানসিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়, ঠিক তখন মস্তিষ্ক বাধ্য করে মাদকটি গ্রহণ করতে। ডা. মেখলা সরকার বলেন, এমন অনেকে আছেন যাঁরা চান না মাদক গ্রহণ করতে, কিন্তু তাঁদের মস্তিষ্ক বাধ্য করে মাদকটি নিতে। বাধ্যগত ব্যবহার শুরু হলে মাদক সেবনের মাত্রাটিও বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে কিছু টাকাপয়সার বিষয়ও জড়িত। সেবনের মাত্রা যত বাড়বে, মাদকের পেছনে খরচের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। তাই প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যরা বুঝতে না পারলেও পরে এভাবেই বুঝে যান।

হেলাল আহমেদ বলেন, অনেক মা-বাবা আছেন যাঁরা বুঝতে পারেন যে তাঁর সন্তান মাদক গ্রহণ করছেন কিন্তু সেটি তাঁরা ধামাচাপা দিয়ে রাখেন। এমনটি না করে যদি আগে থেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে রিহ্যাবে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। রিহ্যাবে যাওয়ার প্রয়োজন তখনই পড়ে, যখন কেউ মাদকে আসক্ত বা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রিহ্যাব হচ্ছে মাদকাসক্তির চিকিৎসার একটি ধাপ। এই চিকিৎসার প্রথম ধাপটি হচ্ছে ডিটক্সিফিকেশন। এটি মাদক গ্রহণে শরীরের যে ক্ষতি হয়, সেটি সারিয়ে তোলার এবং এটি থেকে দূরে রাখার একটি প্রক্রিয়া। এরপর মাদক গ্রহণ না করার ফলে রোগীর প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ দেখা দেয়। এ জন্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
ডা. মেখলা সরকার, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালছবি: ফেসবুক
পরের ধাপে ভবিষ্যতে মাদক গ্রহণ না করার মোটিভেশন করা হয়। সর্বশেষ ধাপটি হচ্ছে রিহ্যাবিলিটেশন, অর্থাৎ মাদকাসক্তির আগে রোগীর যে সামাজিক অবস্থা ছিল, সেখানে ফিরিয়ে নেওয়া। কিন্তু আমরা মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও নিরাময়কেন্দ্রকে রিহ্যাব বলে থাকি। এটি সঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাদকাসক্তিকে মানসিক রোগ বলে চিহ্নিত করেছে এবং এর চিকিৎসা মানসিক রোগবিশেষজ্ঞরাই করে থাকেন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাপ্রক্রিয়া, যা ধৈর্য সহকারে সুষ্ঠুভাবে না করলে রোগীর আবার আসক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে বলে জানান হেলাল আহমেদ। আর এই চিকিৎসা ঘরে থেকেও করা সম্ভব। সে জন্য মানসিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের অবশ্যই রোগীর প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল হতে হবেই। এর কোনো বিকল্প নেই।

মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ কৌতূহল। এই কৌতূহল থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে সচেতনতা। এ জন্য তথ্যভিত্তিক চিন্তা পরিবর্তন করে জ্ঞানভিত্তিক অবস্থানে আসার পরামর্শ দেন হেলাল আহমেদ। কারণ, জ্ঞানের চোখ যদি খুলে যায়, তাহলে অযাচিত কৌতূহল থাকে না।

ডা. মেখলা সরকারে বলেন, তরুণ বয়সের ছেলেমেয়েরা যেহেতু বেশি কৌতূহলপ্রবণ হয়ে মাদক গ্রহণ করে, সেহেতু অভিভাবকের একটা ভূমিকা রয়েছে এখানে। তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে মা-বাবা সন্তানদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটান, ছেলেমেয়েদের আত্মসম্মানবোধ বা আত্মবিশ্বাস বেশি থাকে এবং মা-বাবার সঙ্গে খোলাখুলি সম্পর্ক থাকে, তাদের মাদকাসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে।

চাইল্ড এডোলেসেন্ট এন্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি,
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা
আহমেদ হেলাল, সহযোগী অধ্যাপক, চাইল্ড এডোলেসেন্ট এন্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকাছবি: ফেসবুক
অনেক মা-বাবা ছেলেমেয়েকে অবাধে টাকা-পয়সা দেন, এতে তারা কৌতূহলবশত মাদক কেনার সুযোগ পায়। এটি থেকে যেমন মা-বাবাকে বিরত থাকতে হবে, এ ছাড়া সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে, যাতে তারা যেকোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে মা-বাবাকে নির্দ্বিধায় সেটি সম্পর্কে বলতে পারে। ডা. মেখলা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তরুণদের উদ্দেশে বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরবে কিন্তু তাদের সব কার্যক্রমে যুক্ত হতে নিজেকে প্রশ্ন করবে, নিজের বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে হবে এতে তার দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না। এই বিবেচনাই তরুণদের মাদক থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English