মাদকেই সর্বনাশ! সারা দেশে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সহায়তায় চলছে মাদক সেবন ও বিক্রি। মাদকের টাকায় বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে কিশোর গ্যাং। তারা শুধু ধর্ষণই করে না, চাঁদাবাজি, খুন, জমি দখলসহ নানা অপরাধে জড়িত। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অধিকাংশ কিশোর ও যুবক। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাং সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর এতে হুমকির মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, ধর্ষণ, খুনসহ অপরাধের ৮০ শতাংশেই মাদকাসক্তরা কোনো না কোনোভাবে জড়িত। সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ মাদকাসক্তি।
এ ব্যাপারে পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, যেসব সীমান্ত দিয়ে মাদক আসে, সেই সব স্থান থেকে মাদক আসা বন্ধ না করলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বর্তমানে দেশে মাদক যেভাবে ছড়িয়েছে, তা পুলিশের পক্ষে একা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ দলমতনির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।
সন্তান ধর্ষক, খুনি, বখাটে, সন্ত্রাসী, মাদকসেবী হবে এটা কেউই চায় না। দেশে সংঘটিত ধর্ষণ, খুনসহ অপরাধের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগের পেছনেই মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত থাকে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পরও কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না মাদক। মাদক সেবন করার পরে অনেকের মধ্যে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ক্ষেত্রে মাদক বেশি প্রভাব ফেলে। অনেকেই মাদক সেবনের পর পরিবেশ পরিস্থিতির সুযোগে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়। সম্প্রতি ধর্ষণ নিয়ে রীতিমতো হইচই চলছে। ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন ও বিক্ষোভ করছে সাধারণ মানুষ। সরকারপ্রধানের নির্দেশে আইন পরিবর্তন করে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসের শেষ দিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এরপর থেকে সীমান্তবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যদের মধ্যে অনমনীয় মনোভাব দেখা দিয়েছে। এ কারণে কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকা থেকে গত দুই সপ্তাহ ধরে দ্বিগুণ হারে মাদক আসছে। দেশে মোট ইয়াবার ৮০ ভাগ আসে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে। সড়ক, আকাশ ও নৌপথে মাদক আসছে। তবে নৌপথে বেশি আসছে। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা লেখাপড়া বাদ দিয়ে মাদকের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। তেজগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এখানে চিকিত্সা নিতে আসা মাদকাসক্তদের মধ্যে ইয়াবায় আসক্ত সর্বাধিক। জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাদকের মধ্যে গাঁজা এক নম্বরে, দুই নম্বরে ইয়াবা।
গত ১ জানুয়ারি রাত ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। র্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেফতার হয় ধর্ষক মজনু। আদালতে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার চলছে। মজনু পুরোপুরি মাদকাসক্ত। সে হেরোইন ও ইয়াবার মতো মাদক সেবন করত। মাদক সেবনের পর এভাবে বহু নারীকে সে ধর্ষণ করেছে। সম্প্রতি স্বামীর সামনে থেকে স্ত্রীকে তুলে নিয়ে সিলেট এমসি কলেজে ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় চলছে। আসলে এ ঘটনার নেপথ্যে আরো কিছু ঘটনা রয়েছে, তা কেউ প্রকাশ করেনি। এ ঘটনায় আট জন গ্রেফতার হয়ে আদালতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করেছে। পুলিশ বলছে, ধর্ষণে জড়িতদের প্রায় সবাই মাদকসেবী। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন স্বামীর জন্য রক্ত আনতে গিয়ে ধর্ষণের ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করে র্যাব। গ্রেফতারকালে ধর্ষকেরা মাদক সেবন করেছিল। এছাড়া চলতি বছরের ১৩ মার্চ রাতে কাওলার ঝোপে এক কিশোরী গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ধর্ষক আলমগীর ওরফে পাঁয়তারা আলমগীর (২৬), জালাল উদ্দিন ওরফে বাবু (২০), রুবেল হাওলাদার (৩০) ও ধর্ষণে সহায়তাকারী শিল্পী খাতুন (২৪) মাদকসেবী। এর বাইরে রামপুরায় মাদকাসক্ত বাবুর্চির দুই বোনকে ধর্ষণ, ঈদে নতুন জামাকাপড় দেওয়ার কথা বলে তুরাগের কামারপাড়ায় শিশু ধর্ষণ, খিলক্ষেতে বেড়াতে গিয়ে এক নারী ধর্ষণ, ঢাকার দোহার উপজেলায় হত্যার ভয় দেখিয়ে কিশোরীকে একাধিকবার ধর্ষণ, চিকিত্সার কথা বলে গাজীপুরের শ্রীপুরে এক রোগীকে বাংলোতে নিয়ে ধর্ষণ, মিরপুরে গৃহকর্মী ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের সবাই মাদকসেবী। সর্বশেষ নোয়াখালীতে গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বিবস্ত্র করে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গেও মাদকের সংশ্লিষ্টতা আছে। গ্রেফতারকৃত চার জন মাদক সেবনে অভ্যস্ত বলে তথ্য বেরিয়ে এসেছে। স্ত্রী তানিয়া আক্তারকে বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দেয় ইয়াবায় আসক্ত আল আমিন। কয়েক দফায় কিছু টাকা বাবার কাছ থেকে এনে স্বামীর হাতে তুলে দেন তিনি। ঐ টাকায় ইয়াবা সেবন করে তার স্বামী। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে মাদকসেবী স্বামীর ছুরিকাঘাতে খুন হন ঐ গৃহবধূ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি, যার মধ্যে ১ কোটি মাদকাসক্ত।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেহজাবীন হক বলেন, তরুণ প্রজন্ম সব সময় নতুন কিছু করতে চায়, নতুন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায়। এর বাইরে নিষিদ্ধ দ্রব্যের প্রতি তাদের আকর্ষণ থাকে। সেই আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদেরকে দিয়ে বেআইনি কাজগুলো করানোর চেষ্টা করে থাকে। তিনি জানান, ক্রমাগত মাদক নেওয়ার ফলে তরুণদের নিকট মাদকের চাহিদা বেড়ে যায়। মাদকের এ চাহিদা পূরণের জন্য তারা অনৈতিক কাজ শুরু করে। তারা ছিনতাই, খুনসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, তরুণরা মূলত পারিপার্শ্বিক বন্ধু মহলের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে ইয়াবার মতো মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে যায়। এক সময় ব্যক্তি জীবনের যে কোনো প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে সংকট ব্যক্তির মধ্যে একাকিত্বের ছাপ পড়ে। ফলে তারা ইয়াবার মতো মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে যায়। তবে একেক ঘটনার গল্প একেক রকম। চলমান ধর্ষণের মতো ঘটনার সঙ্গে মাদকের ঘটনা জড়িত জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত মাদকে আসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিচ্যুত যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। ব্যক্তির অপোজিট লিঙ্গের প্রতি যে সম্মান সে সম্মান তারা ধরে রাখতে পারে না। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্য সরকার, সমাজ, রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন্স) ডিআইজি ড. মাসুম রাব্বানী বলেন, করোনা ভাইরাসের চেয়ে ভয়াবহ হলো মাদক। করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিত্সা সম্ভব, কিন্তু কেউ যদি মাদকে জড়িয়ে পড়ে তাহলে সে পরিবারসহ সঙ্গে সঙ্গে সমাজেও বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মাদক নির্মূল করতে হলে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতেই হবে। এক্ষেত্রে শিথিলতার কোনো সুযোগ নেই।