সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৮ অপরাহ্ন

মুক্তিযোদ্ধা সনদ পুনঃযাচাই হবে উপজেলা ও মহানগরে

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৫১ জন নিউজটি পড়েছেন

আইন ও বিধিবহির্ভূতভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গেজেটভুক্ত হওয়া ৪১ হাজার ব্যক্তির সনদসহ নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। আগে সাত সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি থাকলেও আইনি জটিলতায় এবার নতুন করে চার সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জামুকার ৭১তম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন একাধিক সদস্য।
সূত্র জানায়, প্রতিটি উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে এসব কমিটির নেতৃত্বে বিধিবহির্ভূতভাবে গেজেটভুক্ত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নথিপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চলবে। এ জন্য প্রতিটি উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটিকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশ্নিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার সনদসহ অন্যান্য দালিলিক নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিলে (জামুকা) প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
স্থানীয় এমপি যদি মুক্তিযোদ্ধা হন তাহলে তিনি অথবা জামুকা মনোনীত প্রতিনিধি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন-
স্থানীয় এমপির মনোনীত প্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসক মনোনীত প্রতিনিধি। তবে তাদের অবশ্যই ভারতীয় তালিকা বা লালমুক্তি বার্তায় তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হতে হবে। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটভুক্তির জন্য জামুকার একটি আইন রয়েছে। কিন্তু আমরা নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখেছি, ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ওই আইন অনুসরণ না করে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন। এ কারণে আমরা তাদের আইনের আওতায় পুনঃযাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উপজেলা ও মহানগর কমিটির মাধ্যমে তাদের নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। এ জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির কাছে নথিপত্রের আলোকে যারা প্রমাণিত হবেন, তাদের ফের গেজেটভুক্ত করা হবে। নয়তো তাদের গেজেট ও সনদ বাতিল করা হবে।’
বেআইনিভাবে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এর সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজার হতে পারে। কিন্তু তাদের মধ্যে যাদের নাম ভারতীয় তালিকা বা লালমুক্তিবার্তায় রয়েছে, তাদের গেজেট বাতিল হবে না এবং যাচাই-বাছাইয়েরও প্রয়োজন হবে না। তাই সব মিলিয়ে এর সংখ্যা আরও কমবে।
সভায় অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, শাজাহান খান এমপি, মো. আবদুস শহীদ এমপি, মোতাহার হোসেন এমপি, মো. শহীদুজ্জামান সরকার, সাবেক সচিব যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রশিদুল আলম ও মেজর (অব.) ওয়াকার হাসান বীরপ্রতীক এবং জামুকার মহাপরিচালক মো. জহুরুল ইসলাম রোহেল। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বাতিলসহ এ-সংক্রান্ত বিষয়ে জামুকা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সরকারি সংস্থা। বিধি অনুসারে পদাধিকারবলে প্রধানমন্ত্রী জামুকার উপদেষ্টা।
জামুকা সূত্রে জানা যায়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০০২ অনুযায়ী কোনো মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থীর তথ্য সংবলিত আবেদন প্রথমে নিজ উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে যাচাই হয়। উপজেলা কমিটির সুপারিশে প্রাথমিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হলে ওই তালিকা জামুকায় পাঠানো হয়। জামুকার সভায় তদন্ত ও অনুমোদনের পর ওই মুক্তিযোদ্ধাকে গেজেটভুক্ত করে মন্ত্রণালয়। কিন্তু ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আইন ও বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় ৫৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে যারা ভারতীয় তালিকা বা লালমুক্তি বার্তায় অন্তর্ভুক্ত আছেন, তাদের যাচাই-বাছাই করা হবে না।
পরিচয় প্রকাশের অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পুনঃযাচাইয়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪১ হাজারের বেশি নয়। জামুকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ সপ্তাহে পুনর্গঠিত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির আদেশ জারি করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, দেশে এখন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৮। ভাতাভোগী এক লাখ ৯২ হাজার। তবে তাদের মধ্যে চলতি বছরের মার্চে চালু হওয়া মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ‘ডাটাবেজে’ এখনও পর্যন্ত তালিকাভুক্ত হয়েছেন প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার মুক্তিযোদ্ধা। চলতি মাসে শুধু তাদের জন্যই ভাতা বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্যদের নাম, ঠিকানার ভুলসহ বিভিন্ন কারণে ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এসব ভুল সংশোধনের পর তাদেরও ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তখন বকেয়া ভাতাও পাবেন তারা।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে এ পর্যন্ত ছয়বার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এর পরও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি সারাদেশে ৪৮৮টি উপজেলা ও মহানগর কমিটি গঠন করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এতে ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির জন্য আবেদনকারী এক লাখ ২৩ হাজার ১৫৪ জন এবং সরাসরি ১০ হাজার ৯০০ জন ও ত্রুটিপূর্ণ পাঁচ হাজার ৫৫৩ জন আবেদনকারীকে যাচাই-বাছাইয়ে অংশ নিতে বলা হয়েছিল। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ‘অ-মুক্তিযোদ্ধার’ অভিযোগ ওঠা ৪৫ হাজার সনদ ও গেজেটধারীকে এবং ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে, তাদেরও যাচাই-বাছাইয়ে অংশ নিতে বলা হয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে এর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। যাচাই-বাছাইয়ের পর সংশ্নিষ্ট কমিটি জামুকায় প্রতিবেদন দাখিল করে। তখন দেশের উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাত সদস্যের ৪৮৮টি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এসব কমিটির কার্যক্রম ও বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সংক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে। প্রায় ১১৬ রিট বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন। এসব কারণে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কার্যক্রমও শেষ করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে জামুকার ৬৯তম সভায় বিধিবহির্ভূতভাবে গেজেটভুক্ত হওয়া প্রায় ৫৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ে কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English