রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫৯ অপরাহ্ন

মুসলিম সংস্কৃতিতে সালাম

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৪২ জন নিউজটি পড়েছেন

সালাম মুসলিম সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার। যার মাধ্যমে এক মুসলিম ভাই তার অপর ভাইকে শান্তির বার্তা জানিয়ে থাকে। সম্ভাষণের মধ্যে সর্বোত্তম অভিবাদন হলো ইসলামী রীতির অভিবাদনÑ ‘আসসালামু আলাইকুম’। অন্যান্য ধর্মেও কুশল বিনিময় বা অভিবাদনের রীতিনীতি রয়েছে। তবে সার্বিক বিবেচনায় অভিবাদনের মধ্যে সবচেয়ে ‘আধুনিক’ এবং সর্বজনীন অভিবাদন হচ্ছে ‘আসসালামু আলাইকুম’। সালাম বিনিময়ের রীতি সম্পর্কে সূরা নিসার ৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তোমাদেরকে যদি কেউ দোয়া করে; তার চেয়ে উত্তম দোয়া অথবা তারই মতো ফিরিয়ে বলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে হিসাব-নিকাশ গ্রহণকারী।’ এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম একে অন্যের সাথে বিনয়ী ও উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে মুসলিমদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যাদেরকে সালাম দিলে (উত্তরে) তারা মাথা নাড়ায়, স্পষ্টভাবে সালামের জবাব দেয় না। এ ধরনের মুসলমানরা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আদেশ অমান্য করছেন। বিনা পয়সায়, বিনা পরিশ্রমে, বিনা কষ্টে ইসলাম আমাদেরকে সাওয়াব অর্জন করার যে অপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছে তা কি আমরা কখনো চিন্তা করে দেখেছি? অথচ আমরা হরহামেশাই এ সাওয়াব থেকে নিজেদের বঞ্চিত করছি! ইসলাম আমাদের এমন সংস্কৃতি দান করেছে, যা অন্য কোনো ধর্মের সাথে তুলনীয় নয়। মুসলিম সংস্কৃতির অন্যতম ধারক বাহক, মানবতার মহান শিক্ষক হজরত মুহাম্মদ সা: ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দিতেন এবং উম্মতে মুহাম্মদির জন্যও অনুরূপ নির্দেশ রেখে গেছেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আনাস ইবনে মালিক রা: বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বাচ্চাদের কাছ দিয়ে গমন করলেন তখন তাদের সালাম করলেন।’ (সুনানে মুসলিম, কিতাবুস সালাম, হা.৫৫০০,৫৫০২) আমর ইবন খালিদ র: আবদুল্লাহ ইবন আমর রা: থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা:কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামের কোন কাজটি উত্তম? তিনি (রাসূল সা:) বললেন, তুমি (অপরকে) খাওয়াবে ও পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম করবে (বুখারি, খণ্ড ১, হা. ১১, ২৭)।
আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা: সবসময় লোকজনকে আগে অভিবাদন জানাতেন। সেই সময় নবীজীর অনেক সাহাবি চেষ্টা করেছেন নবীজীকে আগে সালাম দিতে, কিন্তু কখনোই সফল হননি। নবীজী সবসময় আগে সালাম দিতেন। সালামের রীতির ব্যাপারে রাসূল সা:-এর হাদিস প্রণিধানযোগ্য। হজরত আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আরোহী ব্যক্তি পদব্রজে যাওয়া ব্যক্তিকে সালাম দেবে, পদব্রজে চলে যাওয়া ব্যক্তি বসা ব্যক্তিকে সালাম দেবে এবং ছোট দল (সংখ্যায়) বড় দলকে সালাম দেবে।’ (সুনানে মুসলিম, কিতাবুস সালাম, হা. ৫৪৮৩) নবীজী বলেছেন, তরুণরা প্রথমে অভিবাদন জানাবে গুরুজনদেরকে। যে লোক সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছে সে প্রথমে সিঁড়ি দিয়ে যে লোক উপরে উঠছে তাকে অভিবাদন জানাবে। ইমাম নববী রহ: বলেন, সালাম দেয়া সুন্নত এবং তার জবাব দেয়া ওয়াজিব। উভয় দলের দুই ব্যক্তি সালামের আদান-প্রদান করলে সবার পক্ষ থেকে সালামের দায়িত্ব পালন হয়ে যাবে। সালাম বিনিময় রীতি সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যখন তারা আপনার কাছে আসবে যারা আমার নিদর্শনসমূহে বিশ^াস করে, তখন আপনি বলে দিন : তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের পালনকর্তা রহম করা নিজ দায়িত্বে লিখে নিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যে কেউ অজ্ঞতাবশত কোনো মন্দ কাজ করে, অনন্তর এরপরে তাওবা করে নেয় এবং সৎ হয়ে যায়, তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, করুণাময়।’ (সূরা আনআম-৫৪) এ আয়াত থেকে সালাম প্রচলনের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মহানবী সা: বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের তার ভাইদের কাছ থেকে অধিকার রয়েছে, আর তা হলো তিনি অভিবাদনের উত্তর পাবেন। এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের পাঁচটি হক আছে। আর তা হচ্ছেÑ ১. সালামের জবাব দেয়া ২. হাঁচির জবাব দেয়া ৩. দাওয়াত কবুল করা ৪. রোগীর সেবা করা বা তাকে দেখতে যাওয়া ৫. জানাজায় শরিক হওয়া। (সুনানে মুসলিম, কিতাবুস সালাম, হা. ৫৪৮৭)। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ৬টি অধিকারের কথা বলা হয়েছে। (সুনানে মুসলিম, কিতাবুস সালাম, হা. ৫৪৮৮) রাসূল সা: বড়দের যেমন শ্রদ্ধা করতেন ঠিক তেমনি ছোটদেরও স্নেহ করতেন। রাসূলের উম্মত হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত সালামের ব্যাপক প্রচলন ঘটানো। অথচ মুসলিম সংস্কৃতি থেকে সালামের প্রচলন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। নিয়মিত সালাম প্রদানের মাধ্যমে শত্রুর মনও জয় করা সম্ভব। সাক্ষাৎকালে এক মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানের এর চেয়ে চমৎকার দোয়া আর হয় না। সমাজের কোনো নিরীহ মানুষকে সালাম দিলে বড্ড খুশি হয়। ভালোবাসা ও সাওয়াব দুটোর মেলবন্ধন এখানে চমৎকারভাবে কাজ করে। সমাজে প্রাচীর হয়ে থাকা শ্রেণিবৈষম্য দূরীকরণে সালামের রয়েছে যথেষ্ট কার্যকারিতা। সালামের গুরুত্ব উপলব্ধির জন্য রাসূল সা: রাস্তার হক আদায়ের ক্ষেত্রে সালাম দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সালাম আদান-প্রদানে কৃপণতা প্রদর্শন না করে নির্বিচারে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে সালামের ব্যাপক প্রচলন ঘটানো প্রতিটি মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য।
ঈমানের পূর্ণতা পেতেও সালামের গুরুত্ব অপরিসীম। হাদিসে এরশাদ হয়েছে, আম্মার রা: বলেছেন, তিনটি গুণ যে আয়ত্ত করে সে (পূর্ণ) ঈমান লাভ করে : ১. নিজ থেকে ইনসাফ করা ২. বিশে^ সালামের প্রচলন করা ৩. অভাবগ্রস্ত অবস্থায়ও দান করা। (বুখারি, ঈমান অধ্যায়, সালাম প্রচলন অনুচ্ছেদ)। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের একাধিক নির্দেশ সালামের বিধানকে গুরুত্ববহ করেছে। মুসলিম সংস্কৃতিকে সুদৃঢ়করণে সালামের গুরুত্ব অপরিসীম। যা মুসলিম সমাজের পরিচয়ের নিদর্শনই নয়, অন্যতম ভূষণও বটে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English