রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০৬ অপরাহ্ন

মুহাম্মদ সা: ন্যায়-ইনসাফের আলোকবাতি

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪৬ জন নিউজটি পড়েছেন

আঁধারময় পৃথিবীতে অনাচারের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে দিন দিন। স্বজনপ্রীতির উত্তাল তরঙ্গে তলিয়ে গেছে ইনসাফের কিসতি। সমাজের পরতে পরতে শান্তির স্নিগ্ধ বাতাস প্রবাহিত করতে নবীজী সা:-এর দিকনির্দেশনার বিকল্প কিছু নেই। তাঁর কালজয়ী কথামালা উম্মাহর মুক্তির রাজপথ। উম্মাহকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে চঞ্চল উচ্চারণে আশাবাদের কথা শুনিয়ে বলেছেন, ‘ন্যায় বিচারকগণ (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর নিকটে নূরের মিম্বারসমূহে মহামহিম দয়াময় প্রভুর ডানপার্শ্বে উপবিষ্ট থাকবেন। তাঁর উভয় হাতই ডান হাত (অর্থাৎ সমান মহিয়ান)। যারা তাদের শাসনকার্যে তাদের পরিবারের লোকদের ব্যাপারে এবং তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্বসমূহের ব্যাপারে সুবিচার করে’ । (মুসলিম : ১৮২৭)
ন্যায়পরায়ণতার সীমানা জীবনের নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে আছে জীবনের মোড়ে মোড়ে। রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচার কার্যক্রম, দণ্ডবিধি কার্যকর, সংক্ষুব্ধ দু’টি দলের মধ্যে ফায়সালা, পরিবার ও সমাজের মানুষের সাথে কথাবার্তা ও আচরণসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। নবীজী সা:-এর ইনসাফময় জীবনের হাজারো ঘটনা থেকে আমরা এ প্রবন্ধে কয়েকটি উল্লেখ করছি।
ক. নবীজী সা: পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর ইনসাফের শিক্ষা কিয়ামত অবধি সব মানুষের চলার পাথেয়।
একবার চুরির অপরাধে মাখযুম গোত্রের এক মহিলার হাত কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। নবীজীর স্নেহধন্য হজরত উসামা রা: নবীজীর কাছে মহিলার হাত না কাটার জন্য বিশেষ সুপারিশ করেন। নবীজী তার সুপারিশ বাতিল করে যে ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন, আসুন তা হজরত আয়েশা রা: ভাষায় শুনি, ‘মাখযুম গোত্রের এক মহিলার চুরির ঘটনা কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলল। এ অবস্থায় তারা বলাবলি করতে লাগল, এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সা:-এর সঙ্গে কে আলাপ করতে পারে? তারাই উত্তরে বলল, একমাত্র রাসূলের প্রিয় উসামা বিন যায়িদ রা: এ ব্যাপারে আলোচনা করার সাহস করতে পারেন। উসামা নবীজীর সাথে কথা বললেন। প্রস্তাব শুনে নবীজীর চেহারার রঙ বিবর্ণ হয়ে গেল। নবীজী বললেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘনকারিণীর সাজা মওকুফের সুপারিশ করছ? হজরত উসামা নবীজীকে বললেন, আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন হে নবীজী। অতঃপর সন্ধ্যাবেলায় নবীজী খুতবায় দাঁড়িয়ে আল্লাহর যথাযথ প্রশংসা করে বললেন, তোমাদের পূর্বের জাতিসমূহকে এ কাজই ধ্বংস করেছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দিতো। অন্যদিকে যখন কোনো অসহায় গরিব সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার ওপর নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মাদ সা:-এর কন্যা ফাতিমাও চুরি করত তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।
তারপর নবীজীর নির্দেশে ওই মহিলার হাত কেটে ফেলা হলো। হজরত আয়েশা রা: বলেন, অতঃপর মহিলা খাটি তওবা করে বিয়ে করল। সে যখন আমার কাছে আসত, আমি তার প্রয়োজন নবীজীর কাছে উপস্থাপন করতাম’। বুখারি : ৬৭৮৬।
বিবদমান দু’পক্ষের ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।’ (সূরা নিসা : ৫৮)
খ. হজরত নুমান ইবনু বাশীর রা: মিম্বরের ওপর বসে থাকা অবস্থায় বলেছেন, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনতে রাওয়াহা রা: (বাবাকে) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি নবীজীর নিকট এসে বললেন, আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভ থেকে আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! সে আমাকে বলেছে আপনাকে সাক্ষী রাখতে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় করো এবং আপন সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করো। নুমান বলেন, অতঃপর তিনি ফিরে গেলেন এবং তার দান ফিরিয়ে নিলেন।’ (বুখারি : ২৫৮৬) এ ঘটনা সম্বন্ধে অবগত হয়ে নবীজী তৎক্ষণাৎ সাহাবিকে সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করার এবং তাকওয়ার নির্দেশ দিলেন। এই হাদিস দ্বারা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, কোনো সন্তানের প্রতি মা-বাবার পক্ষপাতদুষ্ট আদর-আচরণ জায়েজ নেই। কোনো সন্তানের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত হক থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। হকের ক্ষেত্রে সব সন্তানকে সমান ভাগ দিতে হবে। সন্তানদের মাঝে বৈষম্যমূলক আচরণ না করে উচ্ছৃঙ্খল সন্তানকে হৃদয়ের উষ্ণ ভালোবাসা দিয়ে সুপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
গ. পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে আপন হলো তার পরিবার। জীবনের হাসি- কান্না, সুখ- দুঃখ সর্বক্ষেত্রে মিশে থাকে পরিবার নামক বটবৃক্ষের ছায়া। জন্মের দিন থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিরাম সফর করেও এই বটবৃক্ষের ছায়া আমরা অতিক্রম করতে পারি না। পরিবারের মানুষগুলোর সাথে অসংখ্য স্মৃতি ঝলমল করে জীবনের আকাশে। রক্ত পরম্পরায় গড়ে ওঠা এই সম্পর্কে কৃত্রিমতার ঠাঁই নেই। তাই পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতার অমোঘ বাঁধনে জড়িয়ে থাকে আমরণ। প্রিয় নবীজী সা: পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। প্রত্যেকের হক ইনসাফের পাল্লা দিয়ে পূরণ করতেন। কারো হক আদায়ের ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করতেন না। বিষয়টি হজরত আয়েশা রা:-এর কথায় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে, পরিবারের সদস্যদের প্রতি নবীজীর ইনসাফের নমুনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফভিত্তিক বণ্টন করে বলতেন, হে আল্লাহ! এটা আমার পক্ষ থেকে ইনসাফ, যেটুকু আমার সম্ভব হয়েছে। আর যা আপনার নিয়ন্ত্রণে এবং আমার সাধ্যের বাইরে সেজন্য আমাকে অভিযুক্ত করবেন না।’ (আবু দাউদ : ২১৩৪)
‘যা নিয়ন্ত্রণে সেজন্য আমাকে অভিযুক্ত করবেন না’ এই বাক্য দ্বারা নবীজী সা: হৃদয়ের ভালোবাসার কথা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। কারণ স্ত্রীদের ভরণপোষণ, রাত্রি বণ্টন ইত্যাদির ক্ষেত্রে সমতার বিধান রক্ষা করা সম্ভব হলেও ভালোবাসার ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করার বিষয়টি আয়ত্তের বাইরে। তাই নবীজী আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করেছেন।
বাহ্যিক অধিকারের বিষয়গুলোতে পরিবারের সদস্যদের মাঝে ইনসাফ রক্ষা করা অতীব আবশ্যক। হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজী সা: ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তির দুইজন স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু সে একজনের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে যায়, তাহলে কিয়ামতের দিন এক পার্শ্ব ভাঙা অবস্থায় উপস্থিত হবে।’ (তিরমিজি : ১১৪১)
এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, মানুষের সাধ্যক্ষমতার ভেতরের বিষয়গুলোতে পক্ষপাতিত্ব করলে আল্লাহ তায়ালা এর হিসাব নেবেন। কিন্তু যেসব বিষয়ে সমতা রক্ষা করতে মানুষ অপারগ, আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন না। এ সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কারো ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না যা তার সাধ্যাতীত।’ (সূরা বাকারা : ২৮৬)
পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ইনসাফ রক্ষায় মানুষের অক্ষমতার বিষয়টি আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করে বলেন, ‘আর তোমরা যতই ইচ্ছা করো না কেন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি কখনোই সমান ব্যবহার করতে পারবে না; তবে তোমরা কোনো একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ো না ও অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখো না।’ (সূরা নিসা : ১২৯)
নবীজী সা: শত ব্যস্ততার মাঝেও নিয়ম করে পরিবারের খোঁজ-খবর নিতেন। আসরের পর হালপুরসির জন্য প্রত্যেক স্ত্রীর ঘরে যেতেন। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে তিনি ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। ইনসাফের সরলরেখায় অবিচল থাকার জন্য নবীজী কি পরিমাণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন তা নিম্নোক্ত হাদিস থেকে বুঝা যায়। যখন তিনি সফরে বের হতেন, স্ত্রীদের মাঝে লটারি দিতেন। লটারিতে যে স্ত্রীর নাম উঠত তাকে নিয়ে সফরে বের হতেন। (বুখারি : ২৫৯৩)
উল্লিখিত হাদিসগুলো দ্বারা নবীজীর উদারতা, পরিবারের প্রতি ইনসাফভিত্তিক দায়িত্ববোধ, কোমল আচরণ এবং তাদের হকের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টিভঙ্গির আচরণগুলো চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। নিরাপদ ও শান্তিময় পরিবার গঠনে নবীজীর শিক্ষণীয় জীবন থেকে উৎকৃষ্ট কিছু নেই।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English