আজ অনেকক্ষণ ধরে মেঘেদের সঙ্গে ওড়াউড়ি করলাম। দুপুরের খাবারের পুরো বিরতিটা তাদের সঙ্গে খেললাম লুকোচুরি। হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম অফিস-সংলগ্ন স্যার জোসেফ ব্যাংকস পার্কে। সেখানে খোলা মাঠে হাঁটার সময় খেয়াল করলাম, মাটিতে মেঘের ছায়া লুটোপুটি খাচ্ছে। ওপরে চেয়ে দেখি মেঘেরা আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দিচ্ছে। তাদের ভাবখানা এমন, খেলবে আমাদের সঙ্গে ডাঙা-কুমির? একে তো নাচুনে বুড়ো, তার ওপর মেঘেদের উসকানি। নেমে পড়লাম খেলতে।
এই খেলাটা মজার। আমরা ছোটবেলায় খেলতাম। বাড়ির চার ভিটায় ঘর এবং তার সামনে বারান্দা হলো ডাঙা আর পুরো উঠানটা হচ্ছে পানি আর সেখানে থাকবে একজন কুমির। দুই হাতের পাতার বিশেষ মারপ্যাঁচে ঠিক করা হয় কুমির কে হবে।
এরপর বাকিরা এ বারান্দা থেকে ও বারান্দা—এভাবে পার হতে চাইবে। যদি কাউকে কুমির ছুঁয়ে দেয়, তখন সে কুমির হয়ে যাবে। আজ অবধারিতভাবেই আমি হলাম কুমির কিন্তু মেঘেদের সঙ্গে পেরে ওঠা কি চাট্টিখানি কথা। একসময় হাঁপিয়ে উঠে বললাম, তোমরা খেলো, আমি একটু সমুদ্রের বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে নিই।
এরপর হেঁটে ওভারব্রিজটা পার হয়ে চলে গেলাম বোটানি পোর্টে। ওভারব্রিজে উঠতেই হওয়ার তোড়ে মনে হলো আমিও যেন মেঘেদের সঙ্গে উড়ে যাচ্ছি। আসলে মেঘেরা চাইছিল না আমাকে একা ফেলে যেতে, তাই ওরা বাতাসের কানে কানে বলে দিয়েছিল যেন আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আমি বাতাসকে বললাম, বাপু, আমারও তো সত্যিই উড়ে যেতে ইচ্ছা করছে গো কিন্তু আমাকে তো আবার অফিসে ফিরতে হবে; এবারের মতো মাফ করে দাও। শুনে বাতাস মনে হলো একটু মন খারাপ করে তার গতি কমিয়ে দিল। আমি তখন আবার বললাম, মন খারাপ কোরো না, তোমরাই তো আমার বার্তাবাহক; কত দিন মা-বাবাকে দেখি না কিন্তু তোমাদের কোমল স্পর্শে মনে হয় আমি যেন মায়ের কোলেই আছি। আর মা আমার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে আর বলছে, খোকার তো দেখি প্রায় অর্ধেক চুল সাদা হয়ে গেছে। এ কথা শুনে বাতাস আবার জোরে বইতে শুরু করল। মেঘেদের সঙ্গে হুটোপুটি করতে গিয়ে আমি ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। বাতাসের কোমল স্পর্শে সেটা শুকিয়ে শরীরে কেমন একটা প্রশান্তির ভাব এসে গেল।
এভাবে অনেকক্ষণ বাতাসের আদর মাখলাম আর বোটানি পোর্টে আসা বড় বড় জাহাজ থেকে মালামাল নামানো দেখলাম। আহা! এমনি করে অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম মানুষ এসেছিল সেই সুদূর ইংল্যান্ড থেকে। তারপর থেকে শুধু মানুষ আসতেই আছে আর আসতেই আছে, তার কোনো বিরাম নেই। আমরাও একদিন এসেছিলাম। ঠিক কিসের আশায় এসেছিলাম, সেটা বলা মুশকিল। কারণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে, বিসিএস দিয়ে সর্বোচ্চ চাকরিতে ঢুকে কেউ কখনো বিদেশে আসে না। বাংলাদেশকে যতই বলা হোক গণপ্রজাতন্ত্র বা রাজনীতিকদের হাতের পুতুল, আসলে দেশটার আসল মালিক হচ্ছে সরকারি লোকজন। তাই সরকারি লোকজন চাইলেই অনেক কিছু করতে পারে বা অর্জন করতে পারে। ইংরেজরা এ দেশ ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগে কিন্তু রেখে গেছে তাদের সব নিয়মকানুন, যেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই এখন পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ কাজকর্ম চলে। তাই উপনিবেশবাদ গেলেও ঔপনিবেশিকতা থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি।
যা-ই হোক বাতাসের দোল খেতে খেতে আর জাহাজ থেকে মালামাল নামানো দেখতে আমার দুপুরের খাবার সামান্য বিরতি ফুরিয়ে এল। অফিসে ফেরার পথে আবার মেঘেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেঁটে আশা শুরু করলাম। স্যার জোসেফ ব্যাংকস পার্কে অনেকগুলো রাস্তা। ফেরার পথে অন্য রাস্তা নিলাম, যেটা গাছগুলোর মধ্য দিয়ে গেছে। রাস্তায় গাছের ছায়া পড়ে সুন্দর সব কারুকাজ তৈরি করছে। একটা গাছে বসে একটা কোকিল বিরামহীনভাবে ডেকে চলেছে। তার ডাক শুনে আমিও গলা মেলালাম। সেদিন আমার ১০ বছরের মেয়ে তাহিয়াকে বলছিলাম, ছোটবেলায় আমরা কোকিলের ডাক শুনলেই গলা মেলাতাম। আর ওরাও আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডেকে চলত। এখন তাহিয়া বাসায় থাকা অবস্থায় কোকিলের ডাক শুনলেই আমাকে গলা মেলাতে বলে এবং সে-ও মাঝেমধ্যে গলা মেলায়।
পার্কের মধ্যে সাপের চলার মতো আছে একটা আঁকাবাঁকা হ্রদ। সেই হ্রদের ওপর আছে কাঠের সেতু অনেকটা বাংলাদেশের সাঁকোর মতো কিন্তু সাঁকোর মতো নড়বড়ে নয়। সাঁকোটা পার হয়ে ডান দিকের গাছের দিকে হঠাৎ চোখ গেল। সেখানে পাখির জন্য কাউন্সিল থেকে ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটু পরেই বাঁ দিকে দেখি পাশাপাশি দুটি গাছে একইভাবে পাখিদের জন্য ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবেই আসলে এখানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা হয়। কারণ, সবাই জানে প্রকৃতি না বাঁচলে আমরাও বাঁচব না। প্রকৃতিই আসলে আমাদের মা।
হেঁটে হেঁটে পার্ক থেকে বের হয়ে আসার মুহূর্তে আবারও মেঘেদের দিকে তাকালাম। মেঘেদের বললাম, তোমরা তো উড়তে উড়তে সব দেশেই যাও? মেঘেরা বলল, সে আর বলতে, আমাদের তো আর তোমাদের মতো বিমানের টিকিট করতে হয় না আর পাখিদের মতো উড়তে উড়তে ক্লান্তও হতে হয় না, বরং এই অবিরাম ওড়াউড়িতেই আমাদের আনন্দ। আমি বললাম, তোমাদের দেখে আসলেই হিংসে হয়। তোমাদের কোনো ভৌগোলিক বিধিনিষেধ নেই, যেখানে যখন ইচ্ছা যেতে পারো। তোমরা আমার হয়ে একটা কাজ করতে পারো? মেঘেরা উত্তরে বলল, অবশ্যই, তা না হলে আর বন্ধুত্ব কিসের, বলো। আমি বললাম, তোমরা যখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে উড়ে যাবে, দেখবে একজন নারী বাঁশের ঝাড়ের ছায়ায় বসে কাঁথা সেলাই করছেন। আর তাঁর পাশে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছেন। তাঁরাই আমার মা-বাবা। তাঁদের বলবে, তোমাদের খোকা ভালো আছে।
এরপর মেঘেদের দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমরা জানো তখন তাঁরা দুজন কী বলবেন? মেঘ বলল, তুমি জানো তাঁরা কী বলবে? আমি বললাম, অবশ্যই। তাঁরাই তো আমাকে পেটে ধরেছেন, একটা বয়স পর্যন্ত বড় করেছেন। মেঘেরা বলল, তাঁরা কী বলবেন, বলো তো? আমি বললাম, তাঁরা বলবেন, আমরা জানি আমাদের খোকা ভালো আছে। কারণ, আমরা সব সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে তার জন্য দোয়া করি। মেঘেরা বলল, তাহলে আবার তুমি আমাদের কেন বলছ তাঁদের কাছে তোমার ভালো থাকার খবর পৌঁছে দিতে? আমি বললাম, মা-বাবার মন তো, যদিও তাঁরা জানেন যে আমরা ভালো আছি, তবু তাঁরা সেটা অন্যের মুখ থেকে শুনে নিশ্চিন্ত হতে চান। বুঝলে, মা-বাবার মন খুবই স্নেহকাতর। তাঁরা আমাদের কাছে তো কখনো টাকাপয়সা চান না। নিঃস্বার্থভাবে শুধু চান যেন আমরা ভালো থাকি। কারণ, আমাদের ভালো থাকাতেই তাঁদের ভালো থাকা।
এই বলে মেঘেদের আর সুযোগ না দিয়ে অফিসের পথ ধরলাম। আমার কথাগুলো শুনে মেঘগুলো হয়তোবা ক্ষণিকের জন্য থমকে গিয়েছিল অথবা পুরোটাই আমার কল্পনা।