করোনা ভাইরাসের ধাক্কায় দীর্ঘদিন কোয়ারেন্টাইনে ছিল মাঠের রাজনীতি। এ ভাইরাসের ছোবলে স্থবির ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, সাবেক বিরোধী দল বিএনপিসহ সব দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। রাজনীতির নিত্যদিনের সংস্কৃতি বাকযুদ্ধের জাল বোনা কিংবা পলিটিক্যাল ব্লেইম গেমও ছিল অনুপস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে প্রযুক্তির সহায়তায়। ধীরে ধীরে জীবন-জীবিকার তাগিদে স্বাভাবিক রূপে ফেরে জীবনযাত্রা। যদিও বন্দিত্বদশা থেকে বেরিয়ে আগের মতো সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ের কর্মসূচি এখনো অনুপস্থিত। নতুন বছরেও মাঠের রাজনীতির বন্ধ্যাত্ব ঘুচবে কিনা- তা নির্ভর করবে কোভিড পরিস্থিতির ওপর। সেইসঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা, জনমুখী রাজনীতি, মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ, দলে গণতন্ত্র চর্চা ও শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি জনমুখিতা হারাতে হারাতে একটা হতাশাব্যঞ্জক অবস্থায় পৌঁছেছে। রাজনীতি ঠিক না হলে কোনো সংস্কারই হবে না।
সদ্যবিদায়ী বছরে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মুজিববর্ষ হিসেবে পালন করে দলীয় শক্তি সংহত করার যে পরিকল্পনা করেছিল আওয়ামী লীগ, করোনার কারণে তা ভেস্তে গেছে। অন্যদিকে বিএনপির কর্মসূচি ঘুরপাক খাচ্ছিল দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি নিয়ে। জোরালো কোনো কর্মসূচি না থাকলেও কর্মীদের চাপ ছিল। নতুন বছরে নবউদ্যোমে আশায় বুক বাধছে রাজনৈতিক দলগুলো। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আর দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি- নতুন বছরে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাজনৈতিক শক্তি একে অপরের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে কিনা, এটি রাজনীতির অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।
আওয়ামী লীগের তিন চ্যালেঞ্জ : কোভিডে নির্ঝঞ্ঝাট রাজনীতির শেষ দিকে ফণা তুলেছে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। ভাস্কর্য ইস্যুতে মুখোমুখি ছিল হেফাজত-আওয়ামী লীগ। নতুন বছরে মৌলবাদ শক্তির উত্থানকে আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সেইসঙ্গে আমলানির্ভর রাজনীতি, দলে শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখাকেও চ্যালেঞ্জ মনে করছেন তারা। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা থেমে নেই। তাদের উদ্ধত আচরণ দিন দিন বাড়ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়লেও মৌলবাদী শক্তি তাদের কার্যক্রম বিস্তৃতি করছে। অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করে সরকারি দলকে চাপে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে দুর্নীতির কারণে বরাদ্দ যথাযথ জায়গায় পৌঁছুয় না। প্রধানমন্ত্রীর অনুদানও সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছেনি। সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সরকারি দলের দুর্নীতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমলাতন্ত্র নির্ভরতা রাজনীতির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, করোনাকালে আমলানির্ভর রাজনীতি চোখে পড়ার মতো। নতুন বছরেও রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের সাইড লাইনে থাকার অবস্থা বলবৎ থাকবে। আমলানির্ভর রাজনীতি কখনোই শুভবার্তা বয়ে আনে না। রাজনীতি থাকবে রাজনীতিবিদদের হাতে; আমলাদের হাতে নয়। রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে রাখতে হলে সৎ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন বছরে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে নতুন বছরের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ উড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান উদযাপিত হবে যুগপৎভাবে। পাশাপাশি দল গোছানোর পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। মৌলবাদকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন না তারা। দলে শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, দুর্নীতিবাজদের নির্মূল করে সৎ ও ত্যাগীরাই রাজনীতিতে আসবেন। নতুন বছরে করোনার কারণে অসমাপ্ত কাজ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা হবে। জানতে চাইলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক কাগজকে বলেন, কোভিডেও নিশ্চুপ ছিল না আওয়ামী লীগ। করোনা আক্রান্ত মানুষসহ দুস্থ, উপার্জনহীন জনগণের পাশে যেমন দাঁড়িয়েছে তেমনি সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তৎপর ছিল। আগামী দিনে সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি শুদ্ধি অভিযান আরো কঠোর হবে।
দলে গণতন্ত্র ফেরানোই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ : করোনায় স্থবির সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করা ও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করার ইচ্ছে বিএনপির। করোনার সময় মানবিক দিক এবং বয়স বিবেচনা করে শর্তসাপেক্ষে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় সরকার। বর্তমানে তিনি গুলশানের বাসা ফিরোজায় রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভ্যন্তরীন কোন্দলে জর্জরিত বিএনপির নিজ দলে গণতন্ত্র ফেরানোই প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেইসঙ্গে দুর্নীতির দায়ে মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক, সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার কৌশল ঠিক করতে করতেই বছর পার করবে তারা। অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। তারা রাষ্ট্রের গণতন্ত্র চর্চা কিভাবে করবে? প্যানডেমিক সিচুয়েশনে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। পাটকল, চিনিকল, পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব শিল্প-কারখানায় বেকার হয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান করা প্রয়োজন। সবমিলিয়ে চলতি বছর রাজনীতির জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র নেই। কর্মীদের মধ্যে জবাবদিহিতা নেই। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকে দুর্বৃত্তরা; যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায়। এসব সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো মনোযোগ নেই।
নতুন বছরের পরিকল্পনার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নতুন বছরেও এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। নতুন বছরে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিতে বিএনপি কতুটুকু সক্ষম- জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাজাহান বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে গণতন্ত্র নেই। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন থেকে জাতিকে উদ্ধার করা রাজনীতির প্রধান কাজ। ক্ষমতার মালিক জনগণ, তাদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া রাজনীতির চ্যালেঞ্জ। নতুন বছরে অর্থপাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়াসহ সব রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিতে সক্ষম বিএনপি।
অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ : কোভিডকালে বড় রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ না করলেও হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ইসলামী দলগুলো কয়েক দফা সভা-সমাবেশ করেছে। বছর শেষে ভাস্কর্য ইস্যুতে সরব ছিল তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মরণকামড় দিতে পারে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। সেইসঙ্গে নানা ইস্যুতে ঘোলা জলে মাছ শিকারের অপচেষ্টার পাশাপাশি বড় ধরনের নাশকতায় সক্রিয় মৌলবাদী শক্তিসহ জঙ্গিগোষ্ঠীরা। এক্ষেত্রে সরকারি দলকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, শুধু অর্থনৈতিক মুক্তিই নয়; স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল আকাক্সক্ষা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শুধু অর্থনৈতিক উন্নতিতে উন্নয়ন সীমাবদ্ধ নয়। সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও আগামী দিনের রাজনীতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আওয়ামী লীগ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়বে- এমন মন্তব্য করে জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, যত আস্ফালন দেখাক না কেন বাংলার মানুষের কাছে মৌলবাদীরা কখনোই গ্রহণযোগ্য ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না। তাদের আস্ফালন বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। জঙ্গি হামলা, জঙ্গিগোষ্ঠী মোকাবিলা করেই এগিয়েছে আওয়ামী লীগ। এবারো তাদের মোকাবিলা করে সোনার বাংলা গড়ার দিকে এগিয়ে যাবে।