টেকনাফে বসে মিয়ানমারে অর্ডার দেওয়া হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেখান থেকে ইয়াবার চালান আসে টেকনাফে। যেদিন চালান আসে সেদিনই চলে যায় কক্সবাজার, ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে। মুহূর্তেই টাকা চলে আসে টেকনাফের ইয়াবা-কারবারিদের কাছে। সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে চলে যায় সৌদি আরব, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। পরের দিন সেই অবৈধ টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে বৈধ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে। সঙ্গে পাওয়া যায় ২ শতাংশ সরকারি প্রণোদনা। বর্তমানে এভাবেই চলছে ইয়াবা বিক্রির অর্থের লেনদেন! অনুসন্ধানে ভয়ংকর এমন তথ্য উঠে এসেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে টেকনাফ ও কক্সবাজারের ছয় ইয়াবা-কারবারিকে চিহ্নিতসহ তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের অবস্থান নিশ্চিত করা গেছে। দেখা গেছে, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থান করছেন ইয়াবা-কারবারিদের স্বজনরা। তাদের মাধ্যমে অবৈধ এ অর্থ বৈধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। অভিনব এ কৌশল সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আঁচ করতে পারলেও তা প্রতিরোধে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ, প্রমাণের অভাব! একই সাথে ইয়াবা চোরাচালানে সহযোগিতা করছে বিজিপি, এ সুযোগে নতুন নতুন ইয়াবা-কারবারিদের আধিপত্য তৈরি হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিনব এ পন্থা অবলম্বনকারীদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন টেকনাফ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ‘জাফর আহমেদ’ ওরফে ‘জাফর চেয়ারম্যান’। অনেকে তাকে ‘টিটি জাফর’ নামেও চেনেন। জাফর বর্তমানে দুবাই অবস্থান করছেন। সেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন টেকনাফের ইয়াবা-কারবারের মূল সিন্ডিকেট। বাংলাদেশে ইয়াবা-কারবার ও আর্থিক লেনদেনের সার্বিক বিষয় দেখভাল করছেন জাফরের ছোট ভাই, টেকনাফ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান লেডু ও গফুর। ছেলে মোস্তাকও এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। এই ইয়াবা-কারবারের টাকা চলে যায় দুবাইয়ে অবস্থিত জাফরের কাছে। জাফরের সঙ্গে বেশকিছু প্রবাসী বাংলাদেশির চুক্তি আছে। তাদের মাধ্যমে ইয়াবা বিক্রির টাকা রেমিট্যান্স আকারে দেশে ফিরে আসে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লেডু ও গফুর মিয়ানমার থেকে কাঠ ও গরু আমদানির আড়ালে ইয়াবার বড় বড় চালান বাংলাদেশে আনেন। নাফ নদী অথবা সাগর পাড়ি দিয়ে এসব চালান বাংলাদেশের সীমান্তে পৌঁছে দেয় একটি চক্র। এ চক্রের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি/নাসাকা) সদস্যসহ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় কিছু বাংলাদেশি জড়িত। এছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বিজিবি’র কিছু সদস্যের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান রোধ করা যাচ্ছে না বলেও তাদের অভিযোগ।
সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত একটি বাহিনী হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচারকারীদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সেখানে জাফর আহমেদ ও মনিরুজ্জামান লেডুর নাম এসেছে। এদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক প্রতিবেদনেও মাদক-কারবারি হিসেবে জাফর আহমেদের নাম এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা ইয়াবার আর্থিক লেনদেনের ৭০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন ‘জাফর আহমেদ’ ওরফে ‘টিটি জাফর’। দীর্ঘদিন ধরে দুবাই বসেই মিয়ানমারের বড় ইয়াবা-কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু মিয়ানমার নয়, টেকনাফ ও পুরো কক্সবাজারে ইয়াবা চোরাচালানে একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন তিনি। এ কাজে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন তার ছেলে ও দুই ভাই। স্থানীয় রাজনীতিতেও তারা বেশ তৎপর। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত পরিবারটি। জানা গেছে, জাফর আহমেদ আওয়ামী লীগ করলেও আট/দশ বছর আগে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন।
বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়গুলো তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি। ১৫ বছর ধরে মাদক, মানব ও অর্থপাচার নিয়ে কাজ করা সিআইডি’র এক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘মানবপাচার ও ইয়াবা-কারবারের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি শুনেছি এবং জেনেছি। তথ্যপ্রমাণও আছে। কিন্তু এসব টাকা রেমিট্যান্স আকারে দেশে আসছে— বিষয়টি শুনলেও কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনও হাতে পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, মানি লন্ডারিং আইনে প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না। এমনকি তাকে গ্রেফতারও করা যায় না। আমাদের প্রায় এক কোটির মতো প্রবাসী রয়েছেন। ধরে ধরে রেমিট্যান্সের হিসাব যাচাই করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। মাদক-কারবারিরা এমন সুযোগ নিতেই পারেন।
সিআইডি’র অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ থেকে মাদক-কারবারিদের বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে আমাদের কাছে। এমন কয়েকটি ঘটনা তদন্ত করেও দেখা হচ্ছে। বিদেশে যাওয়া সেই টাকা রেমিট্যান্স আকারে দেশে আসছে— এমন খবর শুনলেও সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ এখনও পাইনি। অভিযোগ পেলে অথবা তদন্তে এমন বিষয় এলে অবশ্যই আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।