একদিকে স্কুল-কলেজ বন্ধ, অন্যদিকে কঠোর লকডাউন। ফলে বন্ধ রয়েছে বইয়ের দোকান। হাত গুটিয়ে দিন গুনছেন রাজধানীর নীলক্ষেতের প্রায় ৫০০ ব্যবসায়ী। ভাড়া পড়ে আছে বাকি। চলছে তাগাদা। দোকান মালিকদের সঙ্গে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব দোকানের হাজার হাজার কর্মচারী। দোকান খোলা নেই, তাই চাকরিও নেই অনেকের। কেউ কেউ ঢাকার মায়া কাটিয়ে বেকার হয়ে চলে গেছেন বাড়ি। অভাব-অনটনে হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে।
অথচ তাদের জন্য ‘কেউই এগিয়ে আসেননি। ফিরেও তাকায়নি সরকার’, বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এদিকে বইয়ের বন্ধ গুদামে আলোবাতাসের অভাবে নষ্ট হচ্ছে বই। ফলে সব ধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা। নীলক্ষেতের বই ব্যবসায়ী ফাইজান বুক হাউসের মালিক জসীম উদ্দিন বলেন, ‘তিন মাসের ঘরভাড়া বাকি। আত্মীয়-পরিচিতদের সাহায্য আর ধারদেনা করে সংসার আর কতদিন চালানো যায়। অথচ লকডাউন দফায় দফায় বাড়ছে। বউ-বাচ্চার জন্য দুবেলা খাবার জোগাড় করার উপায় কী হতে চলেছে জানি না।
নীলক্ষেত মার্কেটে বইয়ের দোকান আছে ১ হাজার ২০০টি। করোনায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ। এ কারণে সংকটে দিন কাটাচ্ছেন জসীমের মতো নীলক্ষেতের প্রায় ৫০০ ব্যবসায়ী। গত বছর করোনার প্রথম ঢেউয়ে প্রথম দফার লকডাউন কাটলে খুলেছিল দোকানপাট। তখন মোটামুটি বেচাবিক্রিতে যা হচ্ছিল তা দিয়ে কোন রকম চলছিল সবার। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের দ্বিতীয় দফার চলমান লকডাউনে অধিকাংশের অবস্থায়ই নাজুক বলে জানান ব্যবসয়ীরা। আজিমপুরের বাসিন্দা মিতা বুকসের স্বত্বাধিকারী পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৩
লকডাউনে চাপাকান্না
জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে মাসে সব মিলিয়ে ৩৫-৪০ হাজার টাকা বিক্রি হয়। এগুলো হয় অনলাইনে ও বুকিংয়ে। এর মধ্যে দোকান ভাড়াই কিছুটা কমিয়ে ২৭ হাজার দিই। জবের পরীক্ষাগুলোও এখন হচ্ছে না, তাই সবার মধ্যে গাইডবই কেনারও তাড়া নেই।’
রাতুল লাইব্রেরির মালিক আবুল কালাম আজাদ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত তিনি। সরকারের করোনাকালীন সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ টাকার বই নিয়া বসে আছি, কিন্তু বিক্রি নাই। চা খাই, বাসে উঠি, বাজারে যাই। শুধু স্কুল-কলেজ বন্ধ। তাহলে আমরা খামুটা কী।’
নীলক্ষেতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যানার লেখা ও পিভিসি তৈরির কাজ করেন সুমন দে। সুমন বলেন, ‘এখন আগের মতো অনুষ্ঠানও হয় না, বেচব কার কাছে। স্কুল বন্ধ থাকলেও বাচ্চার বেতন দিতে হচ্ছে। শুধু আমাগোই বেতন নাই।’
নীলক্ষেতের ইসলামী মার্কেটে বই বাইন্ডিংয়ের কাজ করেন রায়হান আহমেদ বাবু। করোনার আগে প্রতিদিন বই বাইন্ডিং করে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় করতেন। মেহেদী বলেন, ‘এখন এমনও দিন যায়, ৫০ টাকা আসে। ভার্সিটি বন্ধ তো তাই ভাইয়েরা কেউ আসেন না। বাড়িতে টাকা দিই না কত দিন; জানি না, মা কী খায়। ওষুধ কেমনে কিনে।’
নতুন পল্টন বাসিন্দা মাজিদুল ইসলাম মঞ্জু একই মার্কেটে বই কম্পোজ, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি, কার্ড ডিজাইনের কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘সারা দিন বসেই দিন কাটাই।’
মিতা বুকসের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আজিমপুরের নিউ পল্টন লাইনে তিনি পরিবারসহ থাকেন। দোকানভাড়া ৩০ হাজার টাকা। এখন বই বিক্রি করে দৈনিক এক-দেড় হাজার টাকার বেশি আয় হয় না। তাই পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ব্যবসা ভালো না হলেও দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারী খরচ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন খরচ তো মাফ হবে না। আবার গুদামে পড়ে থাকা অধিকাংশ বইও নষ্ট হচ্ছে।
বৃহত্তর নীলক্ষেত বই ব্যবসায়ী ইসলামী মার্কেটের সভাপতি বদুল জামান বাবুল বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা খুব কষ্টে আছেন। এসব ব্যবসায়ীকে টিকিয়ে রাখতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা পর্যন্ত দোকানভাড়া ৩০ শতাংশ মওকুফ করেছি।
জিলানী মার্কেটে সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীরা খুব কষ্টে আছেন। এসব ব্যবসায়ীকে টিকিয়ে রাখতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা পর্যন্ত দোকান ভাড়া ৩০ শতাংশ মওকুফ করেছি। তাদের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ব্যবসা ভালো না হলেও দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারী খরচ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন খরচ তো মাফ হবে না। আবার গুদামে পড়ে থাকা অধিকাংশ বইও নষ্ট হচ্ছে।