দেশে প্রতিদিনই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এর কারণ হিসেবে আইনজীবীরা বলছেন, আসামিরা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে যায়। অনেক অপরাধী থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে এর মধ্য দিয়েও আদালত অনেক মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছেন। দৃষ্টান্তমূলক যত সাজা হবে, অপরাধের পরিমাণ তত কমবে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাগুলো বিচারের জন্য ঢাকায় ৯টি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার ৭ নং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৯৩টি মামলার রায় ঘোষণা করেছেন বিচারক। এর মধ্যে সাতটি মামলায় সাজা ও ৮৬টি মামলায় খালাস দিয়েছেন আদালত। অন্য ট্রাইব্যুনালের অবস্থাও প্রায় একই ধরনের। আসামিদের খালাস পাওয়ার কারণ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, অধিকাংশ মামলায় বাদী ও আসামির মধ্যে মীমাংসা হয়ে যায়। আবার অনেক মামলায় সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায় না।
ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ: মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার একমাত্র আসামি মজনুকে গত ১৯ নভেম্বর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত।
ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার ঘোষিত এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আফরোজা ফারহানা আহম্মেদ অরেঞ্জ বলেন, ‘ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলার একমাত্র আসামি মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। এ রায়ে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি।’
মেয়ে ক্ষমা করলেও আদালত পারবে না
রাজধানীর বাড্ডায় নিজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাবা কামাল হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘বাবা হলেন সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেই বাবাই নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করেছেন। মেয়ে আদালতে এসে বলেছেন, তার বাবার বিরুদ্ধে এখন কোনো অভিযোগ নেই। মেয়ে বাবাকে ক্ষমা করলেও আদালত তাকে ক্ষমা করতে পারবে না। তাকে ক্ষমা করলে এই সমাজে ধর্ষণের হার আরও বেড়ে যাবে।’
নিজ মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে কামাল হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আফরোজা ফারহানা আহম্মেদ অরেঞ্জ বলেন, `নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধিকাংশ মামলা বাদী ও আসামি মীমাংসা করে নেয়। অনেক সময় আদালতে সাক্ষী উপস্থিত হয় না। এ জন্য অনেক মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। আদালত এর মধ্য দিয়েও অনেক মামলায় দৃষ্টান্তমূলক সাজার রায় ঘোষণা করেছেন। সাজার পরিমাণ যত বাড়বে নির্যাতনের পরিমাণ ততই কমে আসবে।‘
এ বিষয়ে আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘ধর্ষণ করার অপরাধ অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে রয়েছে শাস্তির বিধান। মামলার পর অনেকে আপস-মীমাংসা হয় যায়। অনেক ক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অনেকে বের হয়ে যায়। নারী ও শিশু নির্যাতনের যে শাস্তি রয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে অনেকটাই কমে আসবে। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জি এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতনের অনেক মামলা হয়। মামলার পর অনেক সময় সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক সময় মামলার ভিকটিম দুর্বল হয়। প্রতিপক্ষের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারে না। নির্যাতন রোধে আইনের সঠিক প্রয়োজন। আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে নির্যাতন কমে আসবে।’
আইনজীবী জয়নাল আবেদীন মেজবাহ বলেন, `ধর্ষণ মামলায় আদালত বেশকিছু দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন রায়গুলোর বাস্তবায়ন। আইনের সঠিক বাস্তবায়ন হলে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন কমে আসবে।‘