সম্প্রতি হেফাজতের তাণ্ডবে অনেকটাই নিশ্চুপ ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সংঘাত চায়নি বলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা মাঠে নামেননি। হেফাজতের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থেকেও সরকারি দলের নীরব থাকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, হেফাজতের দেশবিরোধী তাণ্ডবের মোকাবিলা করার সাংগঠনিক ক্ষমতা আওয়ামী লীগের সব সময়ই আছে এবং থাকবে। বর্তমান পরিস্থিতির দিকটা বিবেচনায় রেখেই নেতা-কর্মীরা ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছে। কারণ মুখোমুখি অবস্থানে গেলে রক্তারক্তি হতো। বাড়ত বহুগুণে হতাহতের সংখ্যা। তাই সংঘাত এড়াতে দায়িত্বশীলতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে সরকারি দল। হেফাজতের এই অপশক্তিকে এবং যারা ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতির ফায়দা নিতে চায় তাদের বিচারের আওতায় এনে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেব। কোনোভাবেই এই অপশক্তিকে মাঠের রাজনীতিতে নামতে দেয়া হবে না বলে নেতারা জানান।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি থাকবে পর্যায়ক্রমে হেফাজতের উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীদের আইনের মাধ্যমে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে হেফাজতের তাণ্ডবের বিচারের দাবি জানানো হবে। এই দাবি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হবে। এই হেফাজতের অবস্থা শিগগিরই কোণঠাসা হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেন এক নেতা।
এই মুহূর্তে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলা ও উগ্র সাম্প্র্রদায়িক গোষ্ঠীর অপতৎপরতা প্রতিরোধ করাই সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, এই দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি কাজের সুসমন্বয় এবং দলের ঐক্য আরো সুসংহত করা জরুরি কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এ সময় ভেদাভেদ ভুলে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ লড়াইয়ের সাহসী কাণ্ডারি শেখ হাসিনার হাতকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। নেতা-কর্মীদের আরো ধৈর্য ধরতে হবে।
হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী নীরব কেন জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, হেফাজতিরা দানবীয় শক্তির মতো তাণ্ডব চালাচ্ছে। তাণ্ডবের কর্মকাণ্ডকে আমরা নিন্দা জানাই, প্রতিবাদ জানাই। এদের তাণ্ডবীয় কর্মকাণ্ডকে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চুপ নই। আমরা এই দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে সব সময় সতর্ক রয়েছি। আমরা চেয়েছি, আমাদের নেতা-কর্মীরা এই দানবীয় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকুক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের প্রতিরোধ করুক। ওরা যখন ধানবীয় অপকর্ম শুরু করেছে, মানুষকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়া, রেললাইনে আগুন দেয়া, থানায় আক্রমণ করা, সরকারি গণগ্রন্থাকার পুড়িয়ে দেয়া, ভূমি অফিস পুড়িয়ে ফেলা ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন পুড়িয়ে ফেলাসহ এই অপকর্ম করে যখন উম্মাদ হয়ে যায়। এই সময় যদি এদের প্রতিরোধ করতে আমাদের কর্মী যেত তখন কী হতো? এখানে রক্তের গঙ্গা বয়ে যেত। শত শত মানুষ মারা যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হতো। এটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতো না।
এখানে আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের নেতাক-র্মীরা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। এর মানে এই নয় যে, তারা ইচ্ছেমতো যা খুশি তাই করবে, আমরা মেনে নেব, ব্যাপারটা তা নয়। তাদের কঠোর আইনের আওতায় এনে চিহ্নিত করে, যারা অংশগ্রহণ করে নির্দেশ দিয়েছে তাদের বিচার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল করে এদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে বাংলাদেশ বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড করতে না পারে। আমরা এই অপশক্তিকে, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতির ফায়দা নিতে চায় তাদেরও আমরা বিচারের আওতায় এনে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেব।’
তিনি বলেন, ‘এরা যে তাণ্ডব চালায়, এটা পাকিস্তানি হায়নাদার বাহিনীকে হার মানিয়েছে। ’৭১-এ স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানের হায়নাদার বাহিনী যেভাবে এদেশের মানুষের ওপরে যান-মাল, সম্পত্তি, সরকারি সম্পত্তি, নারী, পুরুষ ও শিশু যেমন কাউকে বাদ দেয়নি, এরাও একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এরা দেশবিরোধী, এরা পাকিস্তানি আইএসআরের এজেন্ট। এরা আইনশৃঙ্খলা বিরোধী ও অপরাজনীতি করে থাকে।’
এ বিষেয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি, জঙ্গিবাদী শক্তি ও সন্ত্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সব সময় প্রস্তুত। হেফাজত বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিশ্বাস করে না। বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি সমৃদ্ধিকে বিশ্বাস করে না। এরা মনে করে আওয়ামী লীগের উন্নয়নের ধারা অব্যাহতি থাকলে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জঙ্গিবাদী শক্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আসলে এরা বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারে নাই।’
জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেফজত ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে সুনামগঞ্জের শাল্লায় ঝুমন দাস আপন নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। কটূক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের হবিবপুর নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশকিছু বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা।
গত বুধবার (১৭ মার্চ) সকালে এ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে বিক্ষোভকারী, সরকার সমর্থক ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে একাধিক সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
২৬ মার্চ বেলা সোয়া ২টার দিকে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা থেকে কয়েক হাজার হেফাজতকর্মী মিছিল নিয়ে বের হয়। এ সময় তারা হাটহাজারী থানা, ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও ডাক বাংলোতে হামলা চালায়। পরে পুলিশের গুলিতে চারজন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন নিহত হয়। এরই প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলাম গত শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং রবিবার সারা দেশে পূর্ণদিবস হরতাল পালন করে।
এদিকে হতাহতের ঘটনার জেরে ডাকা হরতালে উত্তাল অবস্থায় ছিল ব্রাহ্মণবাডিয়া। রবিবার (২৮ মার্চ) হরতাল চলাকালে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবে ধ্বংসের নগরীতে পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন ও জেলা প্রেসক্লাবসহ অসংখ্য স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে তারা। এসব ঘটনার পরও সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা বড় ধরনের কোনো প্রতিবাদ জানাননি।
পুলিশ ও প্রত্যেক্ষদর্শীরা জানান, হরতাল চলাকালে রবিবার সকাল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তাণ্ডব চালানো হয়। এ সময় শহরের মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রতিষ্ঠানসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় জেলা পরিষদ ভবন, পৌরসভা ভবন, পৌর মিলনায়তন, সদর উপজেলা ভূমি অফিস, পুলিশ লাইন, সদর থানা, খাঁটিহাতা বিশ্বরোড হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি, শহরের কেন্দ্রীয় মন্দির শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি, দক্ষিণ কালীবাড়ি, রেলওয়ে স্টেশন, জেলা আওয়ামী লীগ ও সংসদ সদস্যের কার্যালয়, সরকারি গণগ্রন্থাগার, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকারের কার্যালয়, তার নিজের ও শ্বশুরবাড়ি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগার চত্বর ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন। এই কয়েকদিনে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছে। তবে হেফাজতের এই তাণ্ডবের সময় অনেকটাই নিশ্চুপ ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এই নিয়ে অনেক প্রশ্নও উঠেছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভাধীন পানামসিটির রয়াল রিসোর্ট থেকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে নারীসহ আটক করা হয়। তবে তিনি সেই নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করেছেন। এ সময় হেফাজতের কর্মীরা মামুনুল হককে মুক্ত করে নেয়ার সময় রিসোর্ট ভাঙচুর করে এবং দোকানপাট ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের অফিসও হামলা চালায় বলে স্থানীয় নেতারা জানান।
এর পরও নারায়াণগঞ্জের ক্ষমতাসীন আ.লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তবে এরপর এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কঠোরভাবে জবাব দেয়া হবে বলে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা জানান।