মুসলমানরা একই মায়ের সন্তানের মতো হয়ে যায়। তাদের মধ্যে থাকে না হিংসা-বিদ্বেষ। তারা হয়ে যায় একে অন্যের জন্য রহমত স্বরূপ। যে বৈশিষ্ট্যাবলি গঠিত হয়েছিল মহানবী সা:-এর সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সহচররা কাফিরদের প্রতি বজ্রকঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল’ (সূরা আল ফাতাহ-২৯)। আরো ইরশাদ করেন, মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও’ (সূরা আল হুজরাত-১০)। আরো ইরশাদ করেন, ‘আর তোমরা সে নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ।’ (সূরা আলে ইমরান-১০৩) অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত দেয়, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই।’ (সূরা আত তাওবা-১১) অর্থাৎ কুফর ও শিরক থেকে তওবা করলে, নামাজ পড়লে ও জাকাত দিলে মুসলমান বলে গণ্য হবে। মহানবী সা: তাঁর বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘তোমাদের রক্ত এবং ধন-সম্পদ পরস্পরের জন্য আজকের দিন, বর্তমান মাস এবং বর্তমান শহরের মতোই পবিত্র। শোনো! জাহেলি যুগের খুনও খতম করে দেয়া হয়েছে। (আর রাহিকুল মাখতুম)
মুসলমানের বন্ধু মুসলমান : মুসলমানের প্রধান শত্রু হলো প্রথমত ইহুদি, তারপর মুশরিক, তারপর খ্রিষ্টান। তাই মুসলমানরা তাদেরকে বন্ধু বানাতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা মুমিনদেরকে বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধু বানাবে না।’ (সূরা নিসা-১৪৪) আরো ইরশাদ করেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধু বানাবে না’ (সূরা মায়েদা-৫১)।
মুসলমানের পারস্পরিক করণীয় : এক মুসলমান অপর মুসলমানের হিতাকাক্সক্ষী। তার ভাইয়ের জন্য রয়েছে অনেক করণীয়। মহানবী সা: বলেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই। ফলে সে কোনো মুসলমানের ওপর জুুলুম করতে পারে না এবং কোনো মুসলমানকে মজলুম অবস্থায় ফেলে যেতে পারে না। যে ব্যক্তি অপর ভাইয়ের উপকার করে, আল্লাহ তার উপকার করেন। যেকোনো মুসলমানের কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ তার পরকালীন কঠিন কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখে, আল্লাহ তায়ালা বিচার দিবসে তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবেন।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২০)
মুসলমান ভাইয়ের হক : এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের অনেক হক রয়েছে। মহানবী সা: বলেন, ‘এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের রয়েছে ছয়টি হক। জনৈক সাহাবি আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হকগুলো কি কি? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, ১. তার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হলে তাকে সালাম দেবে; ২. সে তোমাকে দাওয়াত দিলে দাওয়াত গ্রহণ করবে বা কোনো কাজে ডাকলে ডাকে সাড়া দেবে; ৩. সে তোমার কাছে কল্যাণ কামনা করলে, তার কল্যাণকামী হবে; ৪. সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে তুমি উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে; ৫. সে অসুস্থ হলে তার সেবাশ্রুশ্রƒষা করবে এবং ৬. সে মারা গেলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে’ (সহিহ মুসলিম)।
মুসলমানের মর্যাদা : হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিতÑ ‘মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে সাধারণ ফেরেশতাদের চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী’ (বায়হাকি ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৭৪)। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, সাধারণ মুমিন আল্লাহর কাছে কিছু কিছু ফেরেশতা থেকে সম্মানী। (তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৩) মুসলমানরা আল্লাহর বন্ধু। হাদিসে কুদসিতে রয়েছেÑ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুসুলভ আচরণ করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছি’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
মুসলমানদের বর্তমান আচরণ : বর্তমানে মুসলমানদের আচার-আচরণ খুবই দুঃখজনক। বিয়ের অনুষ্ঠানে গোশত কম পাওয়ায় মারামারিতে কয়েকজন আহত এবং একজন নিহত। বিয়ে অনুষ্ঠানে খাদ্য পরিবেশনে বিলম্ব হওয়ায় মারামারিতে কয়েকজন আহত। মোরগ নিয়ে মারামারিতে একজন নিহত। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের শিশু সন্তানকে হত্যা ইত্যাদি নিত্যদিনের ঘটনা। সুদ, ঘুষ, মদ, জিনা-ব্যভিচার, পরকীয়া, বেপর্দা ও হিংসা, লোভ, অন্যায়, জুলুম-নির্যাতন ইত্যাদি চরমভাবে বৃদ্ধি পয়েছে। কখন যে মুসলমান তাদের মূলঐতিহ্যের দিকে ফিরে আসবে আল্লাহই ভালো জানেন।