দীর্ঘ ১৩ বছর ধৈর্য ও সহ্যের সব পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের পর যখন বোঝা গেল যে আর মক্কায় থাকা যাবে না, তখন হিজরত অনিবার্য হয়ে ওঠে। মহানবী (সা.) মক্কার মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন চুপি চুপি একে একে হিজরত করার জন্য। মহানবী (সা.)-এর এ নির্দেশ পাওয়ার পর সবাই অত্যন্ত গোপনে হিজরতের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। কিন্তু কথাটা গোপন থাকেনি। হিজরতের খবর কোরাইশদের কাছে পৌঁছে গেল। কোরাইশরা সতর্ক হয়ে গেল। এর মধ্যেই মুসলমানরা একা একা অথবা একাধিকজন মিলে বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্পত্তি সব ফেলে মদিনায় হিজরত করতে লাগলেন।
বিষয়টি মোটেও হালকা ছিল না। নিজের চিরচেনা ঘর, পরিবার, সহায়-সম্পত্তি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব ফেলে চিরদিনের জন্য নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। সাহাবায়ে কেরাম সেই কঠিন ব্যাপারটিকে একেবারে সহজ করে নিয়েছিলেন বিশ্বাসের উত্তাপে—ঈমানের দহনে। সেই সারিতে শামিল হয়েছেন আবু সালামা (রা.)। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে সালামা (রা.)।
হিজরতের সময় উম্মে সালামা ও তাঁর স্বামী আবু সালামা (রা.) হৃদয়বিদারক এক পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন। উম্মে সালামার পিতার গোত্রের লোকেরা উম্মে সালামাকে কেড়ে নিয়ে যেতে চাইল, আর আবু সালামার গোত্রের লোকেরা এসে আবু সালামার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কেড়ে নিল। স্ত্রী ও শিশুর কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। সব কান্না উপেক্ষা করে আবু সালামার স্ত্রী ও শিশুকে কোরাইশরা কেড়ে নিয়ে গেল। ক্রন্দনরত আবু সালামা (রা.)-এর ঈমান সব কিছুর ওপর বিজয়ী হলো। তিনি চোখদুটি মুছে মদিনার পথে যাত্রা করলেন।
আবু সালামা (রা.)-এর হিজরত করে চলে যাওয়ার পর উম্মে সালামা (রা.)-এর চোখের পানি কোনো দিন শুকায়নি। এক বছর পর আত্মীয়-স্বজনদের মন নরম হলো। তারা শিশুসহ উম্মে সালামা (রা.)-কে উটে তুলে দিল। একমাত্র ঈমানের শক্তি সম্বল করে উম্মে সালামা মদিনার পথে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দেখা হলো উসমান ইবনে তালহা (রা.)-এর সঙ্গে। তিনি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার সঙ্গে আর কে আছে?’ উম্মে সালামা (রা.) জবাবে বলেন, ‘এই শিশু আর আল্লাহ।’ জবাব শুনে উসমান ইবনে তালহা (রা.)-এর বুক কেঁপে উঠল। তিনি উম্মে সালামা (রা.)-কে মদিনায় পৌঁছে দিলেন। (সূত্র : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ইবনে হিশাম : ১/৪৬৮)