মহান রাব্বুল আলামিন বিদ্বেষ পোষণ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূল সা: বলেছেন, তোমরা নিজেদের হিংসার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করো। কারণ হিংসা সৎ কর্মগুলোকে ওইভাবেই খেয়ে ফেলে (বিনষ্ট করে) যেভাবে আগুন কাঠ, খড় পুড়িয়ে ধ্বংস করে। (আবু দাউদ)
নিশ্চয়ই কোনো মানুষ চাইবে না তার অতিকষ্টের ভালো আমল পুড়ে ছাই হয়ে যাক।
সূরা আন-নিসার ৫৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন, ‘অথবা আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন সে জন্য কি তারা তাদেরকে হিংসা করে? তবে আমরা তো ইবরাহিমের বংশধরকেও কিতাব ও হিকমত দিয়েছিলাম এবং আমরা তাদেরকে বিশাল রাজ্য দান করেছিলাম।’
ইহুদিদের হিংসার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন রাসূলকে সা: যে জ্ঞানৈশ্বর্য ও শান-শওকত দান করেছিলেন, তা দেখে ইহুদিরা হিংসার অনলে জ্বলে মরত। আল্লাহ এখানে তাদের সে হিংসাবিদ্বেষের নিন্দা করেছেন এবং তাদের বিদ্বেষকে একান্ত অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের এই হিংসা ঈর্ষা ও বিদ্বেষের কারণটা কী? যদি এর কারণ হয়ে থাকে যে, তোমরাই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী অথচ তা তোমাদের হাতে না এসে তিনি পেয়ে গেছেন, তাহলে তোমাদের এ ধারণা যে একান্তই ভ্রান্ত তা সুস্পষ্ট। কারণ এখন তোমরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। পক্ষান্তরে, যদি তোমাদের বিদ্বেষ এ কারণে হয়ে থাকে যে, রাজক্ষমতা না হয় আমরা না-ই পেলাম, কিন্তু তাঁর হাতে যাবে কেন? রাষ্ট্রের সাথে কী সম্পর্ক? এর উত্তর হলো এই যে, ইনিও নবীগণেরই বংশধর, যাঁদের নিকট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আগে থেকেই ছিল। কাজেই রাষ্ট্র কোনো অপাত্রে অর্পিত হয়নি। অতএব, তোমাদের ঈর্ষা একান্তভাবেই অযৌক্তিক।
রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে চলো। কারণ অনুমান বড় মিথ্যা ব্যাপার। আর কারো দোষ খুঁজে বেড়িও না, গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পরকে ধোঁকা দিও না, আর পরস্পরকে হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না এবং পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করো না। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০৬৬)
সূরা আল বাকারা ১০৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন, ‘সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে বিদ্বেষবশত তারা এটা করে থাকে। অতএব, তোমরা ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো যতক্ষণ না আল্লাহ্ তাঁর কোনো নির্দেশ দেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’ তাই আমাদের ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, কেউ হিংসা করলে তার জন্য হেদায়াতের দোয়া করতে হবে। এক সাহাবি বলেন, আমি আবু বকর সিদ্দীক রা:-কে রাসূল সা:-এর ইনতিকালের পর বলতে শুনেছি, রাসূল সা: হিজরতের প্রথম বছর আমার এই স্থানে দাঁড়ালেন। এ কথা বলে আবু বকর রা: কাঁদলেন, অতঃপর বলেন, তোমরা অবশ্যই সত্যকে আঁকড়ে থাকবে। কেননা তা পুণ্যের সাথী এবং এই দু’টি জান্নাতে (সত্য ও পুণ্য) যাবে। তোমরা অবশ্যই মিথ্যা পরিহার করবে। কেননা তা পাপের সাথী এবং এই দু’টি (মিথ্যা ও পাপ) দোজখে যাবে। তোমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করো। কেননা নিরাপত্তা হচ্ছে ঈমানের পর সর্বাধিক কল্যাণবাহী! তোমরা সম্পর্কচ্ছেদ করো না, একে অপরের পেছনে দুর্নাম করো না, পরস্পর হিংসাবিদ্বেষ পোষণ করো না। আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ভাই ভাই হয়ে যাও। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ,আহমাদ, তহাকিম, ইবনে হিব্বান)
উত্তম আমলের প্রসারতা দেখে কেউ যদি চায় তার নিজের আমলনামা উত্তম করতে, তবে সে ক্ষেত্রে হিংসা করা যাবে। (তবে কোনো ভাবেই অন্যের ক্ষতি কামনা করা যাবে না)
রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘দুটি কাজ ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে হিংসা করা বৈধ নয়। এক. এক ব্যক্তি, আল্লাহ তাকে সম্পদ দিয়েছেন এবং তাকে শক্তি দিয়েছেন সৎপথে তা ব্যয় করতে। দুই. আরেক ব্যক্তি আল্লাহ তাকে হিকমত তথা প্রজ্ঞা দিয়েছেন, সে তা দ্বারা বিচার ফায়সালা করে বা সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্যকে তা শিক্ষা দান করে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
আরবিতে ‘হাসাদ’ শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয় : এক. হিংসা অর্থাৎ কারো ভালো দেখে তার ধ্বংস কামনা করা। এটা হারাম। দুই. হিংসা অর্থ গিবতা অর্থাৎ অন্যের ভালো দেখে (তার ক্ষতি কামনা না করে) তা নিজের জন্য আকাক্সক্ষা করা, এটা বৈধ।উত্তম মানুষেরা কখনো হিংসাবিদ্বেষপরায়ণ হয় না। আর তারাই উত্তম শ্রেষ্ঠ যারা নিজেদের হিংসা থেকে দূরে রেখেছে।
রাসূলুল্লাহ সা:-কে জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষের মধ্যে উত্তম কে? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক নিষ্কলুষ অন্তঃকরণ সত্যভাষী।’ সাহাবারা আরজ করলেন, ‘সুদূকুল লিসান’ তো আমরা বুঝি, তবে ‘মাখ্মূমুল কালব’ কী? তিনি বললেন, ‘নির্মল ও পবিত্র অন্তঃকরণ, যা পাপ করেনি, জুলুম করেনি, যা খিয়ানত করেনি ও যা হিংসাবিদ্বেষ থেকে মুক্ত।’ (ইবনু মাজাহ)
যদি আমরা ভালোবাসা আর সম্প্রীতি মনোভাবের অধিকারী হই তবেই হিংসার ধ্বংস হবে।