‘ভালোবাসা’ শব্দটি শুনলে আমরা প্রতিটি মানুষই শিহরিত হই। কেউবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিয় মানুষকে হারানোর কথা মনে করে অথবা প্রিয় মানুষের দেয়া কষ্টের কথা মনে করে। কেউ বা হারিয়ে যায় কিছু সুখস্মৃতি স্মরণ করে । কিন্তু কারো অনুভূতিই পরিপূর্ণ নয়। ভালো বা খারাপ দুটি অনুভূতিই সাময়িক। কিন্তু হৃদয় কেন যেন তৃপ্তি পায় না। অতৃপ্তি কুরে কুরে খায় যেন। এমন কিছু চায় যা স্থায়ী, অসীম- শেষ হবে না কখনো। আমাদের এই আকাক্সিক্ষত ভালোবাসা কেবল স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসাতে পূরণ করা সম্ভব। ইমাম ইবনুল কায়্যিম আমাদের এই অতৃপ্ত চাওয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘প্রত্যেকটা মানুষের অন্তরে কিছু অস্থিরতা বিদ্যমান, যা শুধু আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব। প্রত্যেকের অন্তরে একাকিত্বের অনুভূতি বিদ্যমান, যা শুধু আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। …আর অন্তরে কিছুটা দুঃখানুভূতি বিদ্যমান, যা কেবল আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার মাধ্যমেই অপসারণ করা সম্ভব।’ (মাদারিজুস সালেকিন ৩/১৫৬)
আলোকিত হৃদয়ের অধিকারী হতে হলে হৃদয়টাকে সবার আগে স্রষ্টার রঙে রাঙাতে হবে। জগতের মানুষের দেয়া কষ্টের অনুভূতি নিমিষেই নাই হয়ে যাবে, যদি স্রষ্টার প্রতি এ ভালোবাসায় আমাদের হৃদয়কে রাঙাতে পারি। ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসার কোনো অনুভূতি আমাদের আর ব্যথাহত করে তুলবে না ক্ষণে ক্ষণে ।
যে উঁচু-নিচু গিরিপথ আমাদের জীবনকে তাল-বেতাল করে দিচ্ছিল, সে পথে আর চলতে হবে না। কেননা, আমাদের হৃদয় যদি এমন এক সত্তার ওপর নির্ভর করে, যিনি অবিচল, তাহলে আমাদের হৃদয় হবে অবিচল। মনকে যখনই দুনিয়ার মায়ায় জড়িয়ে ফেলি, দুনিয়া আমাদের কষ্ট দেয়। কারণ দুনিয়া মানেই হলো, যেটা ক্ষণস্থায়ী, ত্রুটিপূর্ণ। আমাদের মনের মাঝে যে আকাক্সক্ষা আল্লাহ দিয়েছেন, সেটা কেবল কোনো চিরস্থায়ী নিখুঁত জিনিস দিয়েই পরিপূর্ণ হতে পারে।
সব সৌন্দর্যকে নিবিড়ভাবে অবলোকন করতে হবে। কিন্তু নিজেকে সেখানে হারিয়ে ফেলা যাবে না। সেই মন বিহ্বল করে দেয়া সৌন্দর্য আর রঙের বাহারকে ছাড়িয়ে খুঁজতে হবে, সেই সৌন্দর্যের পেছনের কারিগরকে। সেটাই যে আসল সৌন্দর্য। সব রূপ এর উৎস। দুনিয়াবি সব ভালোবাসার আসক্তি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে। আল্লøাহ বলেন, ‘মানুষের মাঝে কেউ কেউ অন্য কিছুকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায়। তারা আল্লøাহকে যেমন ভালোবাসে, তাদেরও তেমন ভালোবাসে। কিন্তু আল্লাহর প্রতি মুমিনদের ভালোবাসা সবচেয়ে প্রগাঢ়।’ (১:১৬৫)
রাসূলুল্লøাহ সা: যখন মৃত্যুবরণ করেন, লোকজন তখন এতটাই শোকাহত যে, কোনোভাবেই খবরটাকে মেনে নিতে পারছিলেন না। তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন যারা, তাদের একজন হলেন আবুবকর রা:। নবীজী সা:-এর প্রতি এত ভালোবাসা থাকার পরও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রকৃত অর্থে কার ওপর আমাদের ভরসা করা উচিত। তিনি বললেন, ‘আপনারা যদি মোহাম্মদের উপাসনা করে থাকেন, তবে মন দিয়ে শুনুন, তিনি মারা গেছেন। আপনারা যদি সত্যিই আল্লাহর ইবাদত করেন, তাহলে জেনে রাখুন আল্লাহ কখনো মারা যান না।’ (সহিহ বুখারি : ১২৪২)
মানসিক প্রশান্তির এমন স্তরে যেতে হলে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সম্পর্ককেই কোনোভাবে পূরণের উৎস হতে দেয়া যাবে না। যদি এটা করতে পারি তাহলে আমরা আর কখনোই ভেঙে পড়ব না। আমরা আর কখনোই শূন্যতা অনুভব করব না। কারণ আমাদের পরিতৃপ্তির উৎস যে কখনোই ফুরাবে না, কমবে না।
হৃদয়টাতে শুধু তাঁকেই রাখুন পরম যতে। শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতিটা মুহূর্তে আমাদের আলহামদুলিল্লাহ বলা উচিত একদম অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। শুধু তাঁরই জন্য তাঁরই প্রতি বিনম্র ভালোবাসায়। স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার জন্য আমাদের আত্মবিশ্বাস, প্রশান্তি ও প্রডাক্টিভিটি বেড়ে যাবে অনেক গুণ। আলোকিত ও প্রশান্ত হৃদয়ের মানুষ হওয়ার পথে আমাদের দীপ্ত পদচারণার শুরু এভাবেই হোক।