বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

হেফাজতে শূন্যতা সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২১
  • ৪৯ জন নিউজটি পড়েছেন
হেফাজত

দেশের ‘ধর্মভিত্তিক’ সবেচেয়ে বড় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শীর্ষ দুই জ্যেষ্ঠ নেতার মৃত্যু এবং ‘ডাকসাইট’-এর নেতারা কারান্তরীণ থাকায় সংগঠনটিতে নেতৃত্ব ‘শূন্যতা’ তৈরি হয়েছে। ফলে সংকট কাটিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি সংগঠনটি। মরহুম আল্লামা আহমদ শফী এবং জুনাইদ বাবুনগরীর অনুসারীদের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলমান রয়েছে। যে কোনো সময়ই তা ‘বিস্ফোরণ’ ঘটতে পারে। সংগঠনের আমির জুনাইদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পর আবারও আলোচনায় হেফাজত ইসলাম। নতুন আমির ঘোষণার পর দুই পন্থির অনুসারীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

হেফাজতে ইসলামের নেতারা জানান, সংগঠনের বহু প্রভাবশালী নেতা কারাবন্দি। এছাড়া ১১ মাসের মাথায় দুই শীর্ষ নেতার মৃত্যুতে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব কতটুকু এগোতে পারবে তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। জুনাইদ বাবুনগরীর চলে যাওয়ায় বড় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এটা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। এমনিতেই সংগঠন কঠিন সময় পার করছে। বর্তমান আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী বড় আলেম ও বিজ্ঞ মানুষ। তবে সাংগঠনিকভাবে অভিজ্ঞ নন।

যদিও হেফাজতের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী সংগঠনে কোনো নেতৃত্ব সংকট দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘বাবুনগরীর জানাজা থেকেই হেফাজতের নতুন আমিরের নাম ঘোষণা হয়েছে। তিনিই আমির দায়িত্ব পালন করবেন। বিরাজমান অবস্থার কারণে আমরা কোনো সভায় বসতে পারছি না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সভা করে সংগঠনের কর্মপন্থা ঠিক করব।’

হেফাজত নেতারা জানান, এখন সংগঠনে তেমন জ্যেষ্ঠ নেতা নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা কাটানো কঠিন। আল্লামা আহমদ শফী ও বাবুনগরী দুজনই বয়োজ্যেষ্ঠ ও সমান্তরাল নেতা ছিলেন। দেশের সবাই তাদের চিনতেন ও সম্মান করতেন। দেশজুড়ে গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বর্তমানের যারা আছেন, বয়োজ্যেষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া বাকিদের নিয়ে নানা ‘বিতর্ক’ আছে। ফলে এখন কমিটি পুনর্গঠন করাসহ আটক নেতাদের মুক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে আল্লামা শফীর সময়ের শেষদিকে সরকারের সঙ্গে হেফাজতের যে সখ্য ছিল, জুনাইদ বাবুনগরী দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি সরকারবিরোধী বলেই পরিচিতি পেয়েছিলেন। এজন্যই তিনি শফী অনুসারীদের বিরাগভাজন হন। যে কারণে শফীপন্থিরা এখনো সক্রিয়। শফীপন্থি বলে পরিচিত মাঈনুদ্দিন রুহী বলেন, ’আমরা মনে করি হেফাজত আগের ধারায় ফিরে আসবে। প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শফীর আদর্শের আমিরের নেতৃত্ব পাবে সংগঠন।’ তারা সংগঠনের নতুন আমির নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে চান।

গত বৃহস্পতিবার সংগঠনের আমির আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী মারা যান। এরপর সর্বোচ্চ এই পদে আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয় আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে। তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসার বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি জুনাইদ বাবুনগরীর মামা। জুনাইদ বাবুনগরীকে দাফনের আগেই তড়িঘড়ি করে নতুন আমির নির্বাচন করা হয়।

সূত্র জানায়, জুনাইদ বাবুনগরীর মারা যাওয়ার পর ঢাকা থেকে সবার আগে বিমানে চট্টগ্রামে পৌঁছান সংগঠনের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী। তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে হেফাজতের নয় সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় খাস কমিটি অর্থাৎ মজলিসে শুরার বেশির ভাগ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। যারা ছিলেন না, তাদের মহাসচিব ফোন দিয়ে মতামত চান। প্রায় সবার মতামত ছিল আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর পক্ষে। পরে তাকেই আমির ঘোষণা করা হয়।

দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বৈঠকে থাকা একজন নেতা জানান, সংগঠনের প্রতিপক্ষরা সুযোগ অপেক্ষায় আছে। তারা কোনো ফাঁকফোকর পেলেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমন শঙ্কা থেকেই আমির দ্রুত নির্বাচন করা হয়েছে। ইসলামী শরিয়া মোতাবেক আমিরকে দাফন করার পূর্বেই নতুন আমির ঠিক করা উত্তম।
হেফাজতের খাস কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, সংগঠন নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে যাচ্ছে। এরই মাঝে তাদের সর্বোচ্চ মুরব্বিকে হারিয়েছে। এর আগে প্রতিষ্ঠাতা আমিরকে হারিয়েছি। অল্প সময়ে দুই প্রভাবশালী নেতার চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। এরও আগে সাবেক মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমিও মারা যান। এখন শক্তিশালী ও ভারসাম্য নেতৃত্ব আসতে সময় লাগবে। হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন রব্বানীর মতে, আমিরের মৃত্যুতে সংগঠনের বিরাট ক্ষতি হয়েছে। এটা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। আশা করি নতুন আমিরের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াবে সংগঠন। হেফাজতের একজন উপদেষ্টা জানান, এই সপ্তাহেই ঢাকায় সংগঠনের মজলিশের শুরার বৈঠক হবে। সেখানে পরবর্তী করণীয় ঠিক হবে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৫ নভেম্বর শফীর অনুসারীদের বিরোধিতার মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের সম্মেলন হয়। এতে সাবেক মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির করে হেফাজতের ১৫১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠিত হয়। নতুন ওই কমিটি গঠনের ছয় মাস না যেতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় বিক্ষোভ থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীরা সারা দেশে তা-ব চালায়। এতে আল্লামা মামুনুল হকসহ কয়েকজন ‘ডাকসাইটের’ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত এপ্রিলের শেষ দিকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেন সংগঠনের আমির জুনাইদ বাবুনগরী। পরে গত ৭ জুন তাকে আমির করেই ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এদিকে আলেম-ওলামাদের ঐক্যবদ্ধ থেকে ইসলামের খেদমত করার আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের নতুন আমির আল্লামা মুহিবল্লাহ বাবুনগরী। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান। বিবৃতিতে মহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, গত ১৯ আগস্ট হেফাজতের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ইন্তেকাল করেন। একই দিন রাতে মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে আমার নাম ঘোষণা করেন। কিন্তু আমার পক্ষে দায়িত্ব পালন করা খুবই কঠিন। কারণ আমি অসুস্থ। তারপরও যেহেতু নাম ঘোষণা হয়ে গেছে, তাই আমি আপানাদের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এ সংগঠনকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

তিনি আরও বলেন, আসুন সবাই এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি। আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে যদি দেশ ও জাতির আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের লক্ষ্যে পরিশ্রম করি, তবে মানুষ তাদের ইমান ও আমল-আখলাকের ব্যাপারে স্বস্তি ফিরে পাবে। দেশের কোটি কোটি মানুষের ইমান, আকিদা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ রক্ষার সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক দীনি সংগঠন। এখন এ সংগঠনকে ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ঘোষিত দাবিগুলো বাস্তবায়নে চেষ্টা করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। হেফাজত আমির বলেন, আমাদের কিছু লোক চলে গেছেন বলে হেফাজতে ইসলাম চলে যাবেÑএটা হওয়া উচিত নয়। মূলত মানুষ পৃথিবীতে আসে ক্ষণিকের জন্য। কেউ এখানে চিরস্থায়ী হয় না। একদিন সবাইকে চলে যেতে হয়। তাই যতক্ষণ প্রাণ আছে, ততক্ষণ আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সঠিক আকিদা-বিশ্বাস, ইসলামী চিন্তা-চেতনা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মেহনত চালিয়ে যেতে হবে।

এসময় মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দেশ ও জাতিকে সব ধরনের সংকট ও বালা-মুসিবত থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করেন। এ ছাড়া হেফাজতের সদ্যপ্রয়াত আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা আহমদ শফীর জন্য দোয়া করেন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English