শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন

শান্তিপূর্ণ পরিবার গঠনে ইসলামের নির্দেশনা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২০
  • ৫৯ জন নিউজটি পড়েছেন

ইসলাম এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এতে পরিবার গঠন, পরিচালনা, পরিবারের সদস্যদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সমাজের একক হলো পরিবার। পরিবারের মূল নিয়ামক হচ্ছে স্বামী এবং স্ত্রী। বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে যাদের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে নতুন প্রজন্ম তৈরিতে উভয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে সুখী-সমৃদ্ধ শান্তিময় পৃথিবী গড়তে হলে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক ব্যবস্থার ওপর।
পৃথিবীর প্রথম মানব আদম আ: ও হাওয়া আ:-এর মধ্যে স্বর্গীয় এক বন্ধন স্থাপনের মাধ্যমে বিয়ের যাত্রা শুরু হয়েছে । বিয়ে এমন এক বন্ধন যা নারী ও পুরুষের মধ্যে যৌনসম্পর্ক সাধনের আইনগত ও সামাজিক চুক্তিবিশেষ। যার মাধ্যমে একজন অপরজন হতে উপকৃত হওয়ার বৈধ অধিকার লাভ করে। সভ্যতা সৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। বিয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে এর সূচনা হয়। মানবশিশুর জন্মদান, বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকা ও যথাযথভাবে বিকশিত হওয়ার মূল দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়।
অজানা-অচেনা দুটি ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠা নারী ও পুরুষের মাঝে ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ বিয়ের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। আল কুরআনে এসেছে, ‘আর তার নির্দেশনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং সৃজন করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা। নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সূরা আর রুম : ২১) অতএব, পরস্পরের মাঝে চিন্তা-চেতনা, রুচি, আদর্শ, মূল্যবোধ প্রভৃতি ভিন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
মানবসভ্যতা বিনির্মাণে নারী-পুরুষ উভয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্ত্রীর ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদসহ সব দায়ভার স্বামীর ওপর বর্তায়। ফলে উপার্জন করার দায়িত্ব একমাত্র স্বামীর এবং পরিবারের সার্বিক অর্থনৈতিক যোগানদাতাও তিনি। এ ক্ষেত্রে স্বামী নিজের সাধ্য ও স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদায় সমন্বয় করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ধনী ব্যক্তি তার সম্পদ অনুসারে ব্যয় করবে, যাকে আল্লাহ সীমিত জীবিকা দিয়েছেন, সে তা থেকে সীমিত পরিমাণে করবে।’ (সূরা তালাক : ৭)
আল্লøাহ তায়ালা স্বামীকে বিশেষ মর্যাদা এবং সম্মানের পাত্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আল কুরআনে এসেছে, ‘আর পুরুষদের জন্য তাদের স্ত্রীদের ওপর মর্যাদা রয়েছে।’ (সূরা আল বাকারাহ : ২২৮)
পরিবার রাষ্ট্রের মূল একক। পরিবার থেকে সমাজের সৃষ্টি, আর সমাজ থেকে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যেমন নেতৃত্বের প্রয়োজন, তেমনি পরিবারও নেতৃত্ববিহীন চলতে পারে না। ইসলাম স্বামীকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেছে। আর নেতৃত্বের দাবি হলো তার অধীনস্থ থাকা এবং আনুগত্য করা। স্ত্রীর কর্তব্য হলো তিনি স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নেবেন, তার সঙ্গত আদেশ-নিষেধের আনুগত্য করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষ নারীদের ওপর কর্তৃত্ব করবে। কেননা, আল্লøাহ তাদের একজনকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।’ (সূরা আন নিসা : ৩৪) অতএব, স্বামীর সম্মান, মর্যাদা ও জ্যেষ্ঠতার কথা চিন্তা করে স্ত্রীর প্রধানতম দায়িত্ব হলো স্বামীর পূর্ণ আনুগত্য করা। ‘স্বামীর কর্তব্য হলো, তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা। রাসূল সা: বলেন, ‘স্ত্রী তার নিজের ব্যাপারে কখনো স্বামীর বিরোধিতা করবে না।’
স্বামীর পরিবারের সদস্যদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীরও। স্বামীর সম্পদ সন্তান-সন্ততি ও পরিজন যারা থাকবে স্ত্রী তাদের সযতœ পরিচর্যা করবেন। এ ছাড়াও স্বামীর আত্মীয়স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করাও তার কর্তব্য। স্ত্রী তাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা, মমতা পোষণ করবেন। তাদের সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। হাদিসে এসেছে, ‘আর নারী দায়িত্বশীল তার স্বামীর সম্পদ, সন্তান ও সংসারের। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’
স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর অধিকার রয়েছে। তবে তা অনুমতি সাপেক্ষে খরচ করতে পারবে। একমাত্র সাদকা ছাড়া অন্য যেকোনো খরচ করার আগে স্বামীর অনুমতি নেয়া স্ত্রীর দায়িত্ব। রাসূল সা: বলেন, ‘স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্বামীর ঘরের কোনো কিছু খরচ করবে না।’
আমাদের সমাজে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত তা অনেকের কাছেই সুস্পষ্ট নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্পর্ক পারস্পরিক ভালোবাসা, আনুগত্য, সহযোগিতা ও সমঝোতার। এখানে স্বামীর কর্তৃত্ব বেশি বলে তিনি যেমন ক্ষমতা প্রদর্শন করবেন না, তদ্রুপ স্ত্রীকেও সর্বদা স্বামীর আনুগত্য প্রদর্শন ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে পারিবারিক যেকোনো কলহ-বিবাদ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। বর্তমানে বিয়ে-বিচ্ছেদের যেসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে, তার পেছনে মূল সমস্যা হিসেবে আনুগত্য, সহযোগিতা ও সমঝোতার ভাব না থাকাকেই মনে করা হয়।
আধুনিক নারীবাদী চিন্তা-চেতনাও এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। তারা নারী অধিকারের নামে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসার পরিবর্তে বিদ্বেষমূলক সম্পর্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্বামী-সন্তানদের সেবাযতœ বাদ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা অফিসে সময় ব্যয় করার ফলে বিভিন্ন পরিবারে তৈরি হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিস্তর দূরত্ব। নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে মায়ের স্নেহ-মমতা থেকে। তৈরি হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক দ্বীন ও মায়া-মমতাহীন এক নতুন প্রজন্ম।
স্বামীকে সন্তুষ্ট ও প্রফুল্ল রাখার দায়িত্ব স্ত্রীর। ভালোবাসার দাবিতে নিজের প্রয়োজনে স্বামী তার স্ত্রীর কাছে যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর কর্তব্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার আহ্বানে সাড়া দেয়া। এটি আদর্শ স্ত্রীর অন্যতম গুণ। রাসূল সা: বলেন, ‘স্ত্রী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। যখন তাকে দেখে তখন চক্ষু শীতল হয় এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রী নিজের সতিত্ব ও তার সম্পদ হিফাজত করে।’ রাসূল সা: আরো বলেন, ‘যে স্ত্রী তার স্বামীকে সন্তুষ্ট রেখে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ তবে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে যদি ইসলামের নীতি আদর্শের বিপরীত কাজ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখা স্ত্রীর দায়িত্ব নয়। কেননা, আল্লøাহর অবাধ্য হয়, এমন কোনো কাজে আল্লাহর কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।
মহান আল্লাহর ইবাদতের পরই সবচেয়ে বড় ইবাদত হলো স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য। রাসূল সা: বলেন, ‘যদি আমি কাউকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম, তবে নারীদেরকে বলতাম তারা যেন তাদের স্বামীদের সিজদা করে।’ অপর এক হাদিসে নারীর জান্নাতে প্রবেশের জন্য চারটি কাজ করতে বলা হয়েছে। তন্মধ্যে দুটি স্বামীর সাথে সম্পৃক্ত। আর তা হলো ‘লজ্জা স্থান হেফাজত করা এবং স্বামীর আনুগত্য করা।’
স্বামীর প্রত্যাশা স্ত্রীর প্রতি যেমনি আদর্শবান হওয়া, স্ত্রীরও স্বামীর প্রতি সেরূপ আদর্শ প্রত্যাশী। রাসূল সা: বলেন, ‘তোমাদের কাছে সেই উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’
অতএব, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো স্বামীর জন্য স্ত্রী এবং স্ত্রীর জন্য স্বামী। তারা উভয়ে সুন্দর, সুখের নীড় এবং সভ্যতা নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। পারিবারিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত ও ভালোবাসাপূর্ণ। পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসা বিশ্বাস পারিবারিক বন্ধনকে অটুট রাখে এবং পারস্পারিক অনাস্থা, সন্দেহ-সংশয়, অবিশ্বাস, আনুগত্যহীনতা সর্বোপরি অবাধ স্বাধীনতা পরিবারব্যবস্থা ধ্বংস করে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English