সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩১ পূর্বাহ্ন

দারিদ্র্য বিমোচন ও জনকল্যাণে ‘ওয়াকফ’

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০
  • ৬৬ জন নিউজটি পড়েছেন

ইসলাম যেসব দান-সাদাকা ও কল্যাণমূলক কাজ সম্পর্কে উৎসাহিত করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সাদাকা যা ‘সাদাকা জারিয়া’ (স্থায়ী সাদাকা) নামে পরিচিত। এর স্থায়ী প্রভাব ও উপকারিতার জন্য ইসলাম এ সাদাকার বিপরীতে অন্য সব সাদাকার চেয়ে আলাদা ধরনের সওয়াব বা পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছে এর সওয়াব স্থায়ী ভিত্তিতে দেয়া হবে। যত দিন মানুষ এর দ্বারা উপকার পেতে থাকবে তত দিন সাদাকাকারী তা পেতে থাকবে। আর এ সাদাকা জারিয়ার মধ্যে সবচেয়ে স্থায়ী সাদাকা হলো ইসলামের ‘ওয়াকফ’ ব্যবস্থা। এটি এমন এক ব্যবস্থা যা দানকারীর জন্য কিয়ামত পর্যন্ত সওয়াবের নিশ্চয়তা বিধান করে। ওয়াকফ ব্যবস্থা ইসলামী অর্থনীতির একটি অনন্য সাধারণ উপায়। দারিদ্র্য বিমোচন ও জনকল্যাণে ওয়াকফের সোনালি ইতিহাস রয়েছে।
ওয়াকফ শব্দের অর্থ স্থগিত করা, আবদ্ধ করা, স্থির রাখা, নিবৃত্ত রাখা ইত্যাদি। কোনো সম্পদের মালিক তার সম্পদকে নিজের মালিকানা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সম্পদ ঘোষণা করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জনকল্যাণ বা জনসেবার জন্য উৎসর্গ করলে একে ওয়াকফ বলা হয়। ‘বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন’ নামক গ্রন্থে ওয়াকফের যে সংজ্ঞা বর্ণনা করা হয়েছে তা হলো : ‘কোনো ব্যক্তি কর্তৃক নিজ সম্পদকে আল্লাহর মালিকানায় সোপর্দ করে তা থেকে প্রাপ্ত আয় কোনো ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দেয়াকে ওয়াকফ বলে।’ ফাতওয়ায়ে আলমগিরীতে ওয়াকফের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ওয়াকফকারী মূল সম্পত্তি নিজের তত্ত্বাবধানে রাখবে এবং তার লব্ধ সম্পদ বা উপকারিতাকে দরিদ্র লোকদের মধ্যে সাদাকা করে দেবে। ১৯৬২ সালের ওয়াকফ আইনে ওয়াকফের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে : ‘কোনো মুসলিম কর্তৃক স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ ইসলামী আইনে স্বীকৃত যেকোনো ধর্মীয় অথবা দাতব্য উদ্দেশ্যে চিরতরে উৎসর্গ করাকে ওয়াকফ বলা হয়।’

এ প্রসঙ্গে আবু হুরাইরা রা: বর্ণনা করেন, রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন : ‘মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি বস্তু ছাড়া অন্যসব কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায় : সাদাকা জারিয়া, উপকারী জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নেক সন্তানÑ যে তার জন্য দোয়া করবে।’
ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি খাইবার এলাকা থেকে এক খণ্ড জমি পেলেন। তিনি রাসূল সা:কে বললেন, আমি খাইবার থেকে একটি জমি পেয়েছি, এর চেয়ে ভালো সম্পদ আমি কখনো পাইনি, এ সম্পর্কে আপনি আমাকে পরামর্শ দেন? রাসূলুল্লাহ্্ সা: বলেন, ‘ইচ্ছা করলে তোমার মালিকানা অটুট রেখে এটি সাদাকা করে দিতে পারো।’ অতঃপর উমর রা: এটি দরিদ্র, নিকটাত্মীয়, দাস-দাসী, দুর্বল ও মুসাফিরদের কল্যাণে সাদাকা করলেন এবং শর্তারোপ করলেন যে, এটি বিক্রয় করা যাবে না, কাউকে দান করা যাবে না এবং উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ এর মালিকানা লাভ করবে না। তবে এর দায়িত্বপ্রাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণকারী ন্যায়ভাবে তা থেকে উৎপাদিত ফল-ফলাদি খেতে পারবে এবং অসচ্ছলকে খাওয়াতে পারবে। (ইবনে মাজাহ ও অন্যান্য একদল ‘রাবী’এটি বর্ণনা করেছেন)
হজরত উসমান রা: রুমা নামক একটি কূপ ক্রয় করেন এবং তা মুসলমানদের ব্যবহারের জন্য ওয়াকফ করেন। জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সা:-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে উসমান রা: এক ইহুদি মালিক থেকে রুমা নামক একটি কূপের অর্ধেক ক্রয় করেন। এরপর পুরো কূপটি ক্রয় করে তা ওয়াকফ করে দেন।
হজরত যায়েদ ইবনে সাবিত রা: বলেন, জীবিত ও মৃতদের জন্য ওয়াকফের চেয়ে উত্তম আর কিছু দেখি না। মৃত ব্যক্তি তার সওয়াব পেতে থাকে আর জীবিত ব্যক্তি জীবদ্দশায় সম্পদের সুবিধা ভোগ করতে থাকে। ওয়াকফকৃত সম্পদ দান করা যায় না, মিরাস হিসেবে বণ্টন করা যায় না এবং তা নষ্ট করারও অনুমতি থাকে না। (আল-ইসআফ ফি আহকামিল আওকাফ, পৃ.২) হজরত জাবির রা: বলেন, নবী করিম সা:-এর সচ্ছল সাহাবিদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যিনি ওয়াকফ করেননি। (ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খণ্ড: ৫, পৃ. ৫৯৭)

ওয়াকফের একটি উদাহরণ হচ্ছে মসজিদে কোবা। মহানবী সা:-এর আগমন উপলক্ষে মদিনায় এটি নির্মিত হয় ৬২২ ঈসায়ী সনে। এর ছয় মাস পর মদিনার কেন্দ্রে নির্মিত হয় মসজিদে নববী, এটি ওয়াকফের দ্বিতীয় উদাহরণ। এভাবে মহানবী সা:-এর সময় এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ওয়াকফ কার্যক্রম চালু হয়। কালের পরিক্রমায় শত শত বছর ধরে ওয়াকফ মুসলিম সমাজে চালু থাকে। আজও এ বিধানটি সীমিতভাবে চালু রয়েছে।
ইসলামের ওয়াকফ ব্যবস্থার পরিধি কেবল ধর্মীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় কারণ ছাড়াও ওয়াকফের আর্থ-সমাজিক গুরুত্ব রয়েছে। ওয়াকফ যেমন দারিদ্র্য বিমোচনে তথা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণ সাধনে ভূমিকা পালন করে তেমনি সর্বসাধারণের কল্যাণেও ভূমিকা পালন করে। আবার এটি ওয়াকিফের নিজের, নিজের সন্তানাদি, পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের কল্যাণেও ভূমিকা রাখে।
ব্যক্তি ও সমাজের যেকোনো কল্যাণমূলক কাজের জন্য ওয়াকফ করা যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা সংস্থার জন্যও ওয়াকফ করা যেতে পারে। নিজের সন্তানদের জন্যও ওয়াকফ করা যায়। আবার সন্তানদের সাথে নাতি-নাতনী বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকেও তাদের সাথে যুক্ত করা যায়। কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করলে তার সব সম্পদও ওয়াকফ করতে পারেন। আবার একই সাথে পরিবার-পরিজন এবং সমাজের কল্যাণমূলক কাজ উভয় উদ্দেশ্যেও ওয়াকফ করা যায়।

কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার কিছু সম্পদ বা সমুদয় সম্পদ নিজের জন্য ওয়াকফ করার ক্ষেত্রে তিনি এমন শর্তও দিতে পারেন যে, তার মৃত্যুর পর তার সন্তানরা এবং পরে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম যুগ যুগ ধরে এই ওয়াকফকৃত সম্পদের উপকারভোগী হবেন। আর যদি সন্তানাদি না থাকে তাহলে তার মৃত্যুর পর ওয়াকফ পরিচালনা কমিটির বা সরকারের ওয়াকফ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সমাজের দুস্থ ও দরিদ্র লোকদের মধ্যে এর মুনাফা বিতরণ করা যাবে। ফলে শত শত বছর ধরে তার এ সম্পদ বিদ্যমান থাকবে এবং তিনি অনন্তকাল যাবত এ দানের সওয়াব পেতে থাকবেন। এ লক্ষ্যে প্রতিটি মুসলিম সমাজে বা দেশে শক্তিশালী ওয়াকফ সম্পদ পরিচালনা কমিটি বা কর্তৃপক্ষ থাকা আবশ্যক।
রাসূল সা: ও তাঁর আদর্শের ধারক ও বাহক সাহাবিরা ‘ওয়াকফ’-এর ভিত্তি এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে, এটি ইসলামী সমাজে যুগে যুগে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। যা মুসলমানদের মানবকল্যাণের আবেগের অকৃত্রিমতা ও কল্যাণকর কাজের প্রতি তাদের আগ্রহের গভীরতার প্রমাণ বহন করে। ধনী মুসলিমরা সমাজের এমন কোনো প্রয়োজন বাকি রাখেননি যা পূরণ করার উদ্দেশ্যে তারা তাদের সম্পদের একটি অংশ ওয়াকফ করে যাননি।
একসময় মুসলিম বিশে^, বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায় প্রায় অর্ধেক জমি ওয়াকফের আওতায় চলে গিয়েছিল। এসব ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আয় থেকে মাদরাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় ও হাসúাতাল চালানো হতো। গরিব-দুঃখীদের প্রয়োজনে বৃত্তি দেয়া হতো। ইসলামী সমাজে সমাজব্যবস্থার ব্যাপক অংশ ওয়াকফিয়া সম্পত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। সে সমাজে দারিদ্র্য উঠে গিয়েছিল এবং সব সেবা প্রতিষ্ঠান ও সব মসজিদ ওয়াকফের আয় দিয়ে চলত।
বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফকিহ্্ ড. ইউসুফ আল-কারাদাভী তাঁর ‘মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আ’লাজাহাল ইসলাম’ নামক গ্রন্থে মিসরের মামালিক যুগের একটি ঐতিহাসিক দলিলের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই দলিলটি হলো, ‘কালাউন ওয়াকফ হাসপাতাল হুজ্জা’। ‘হুজ্জা’ হলো এক ধরনের সরকারি দলিল যেখানে ওয়াকিফ (ওয়াকফকারী) তার ওয়াকফ রেজিস্ট্রি করতেন এবং সেখানে ওয়াকফের সীমা-পরিসীমা ও শর্তাবলি উল্লেখ করতেন। এই ওয়াকফ দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম নিযুক্ত হতেন যাকে ‘নাযের’ (তত্ত্বাবধায়ক) বলা হতো। এই ‘হুজ্জা’-তে লেখা হয়েছে :

“এই ‘বিমারিস্তান’ (হাসপাতাল) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অসুস্থ মুসলিম নারী-পুরুষের চিকিৎসার জন্য। শ্রেণী ও গোত্রের বৈচিত্র্য এবং রোগ-ব্যাধির রকমফেরসহ কায়রো ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে বসবাসকারী ধনী-দরিদ্র ও স্থায়ী-অস্থায়ী সবাই এর সেবা গ্রহণ করতে পারবে। যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষ এখানে প্রবেশ করতে পারবে। অসুস্থ ও দরিদ্র নারী-পুরুষ সুস্থতা লাভ করা পর্যন্ত এতে অবস্থান করবে। এই হাসপাতালের সব সাজসরঞ্জাম চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা যাবে।
ওয়াকফ ব্যবস্থা ইসলামী সমাজের বহুমুখী কল্যাণের এমন একটি কার্যকরী উপায় যা আমাদের সমাজে হারাতে বসেছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণের স্বার্থে এবং সর্বোপরি সাদাকা জারিয়ার মাধ্যমে অনন্তকালব্যাপী সওয়াব লাভের সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন একটি নতুন ওয়াকফ আন্দোলন যা আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English