শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৩ অপরাহ্ন

বিশ্ব অর্থনীতির চালচিত্র

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২০
  • ৪২ জন নিউজটি পড়েছেন

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে। কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পরিবর্তনগুলো দ্রুততর করে দিচ্ছে। শক্তিশালী অর্থনীতির অনেক দেশ পিছিয়ে পড়ছে, লাভজনক কোম্পানির মুনাফা কমেছে, বিপাকে পড়েছে অন্যের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির দেশগুলো। করোনাভাইরাসের এই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে লিখেছেন শওকত হোসেন। ইনফোগ্রাফসগুলো স্ট্যাটিসটা থেকে নেওয়া।

সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এখনো চীন

মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি চীন। বিশ্বব্যাংক বলছে, মূল্য সমন্বয় করলে চীনের জিডিপি এখন ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এক লাখ কোটিতে এক ট্রিলিয়ন। ২০১৭ সালের স্থির মূল্যকে ২০১৯ সালের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করে এই হিসাবটি বের করা হয়েছে। চলতি ২০২০ সাল অস্বাভাবিক বছর। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চীনকে হটানো যাবে বলে মনে করা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রাক্কলন করে বলছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে ২০২০ সালে চীনের অর্থনীতি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে। অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতা সমন্বয় করলে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে ২০২০ সালে দেশটির জিডিপি কমবে ৬ শতাংশ হারে।

আইএমএফ জানাচ্ছে, ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের কারণে এশিয়ার দেশগুলোই ভালো করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর বিপরীতে জার্মানি বা যুক্তরাজ্যের মতো ইউরোপের বড় দেশগুলো কিংবা এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশ জাপান খুব ভালো করতে পারছে না। চলতি বছরে তাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

আইএমএফের মতে, ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখবে। অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় থাকবে এই দুই দেশ। তবে এ সময়ের মধ্যে জার্মানিকে সরিয়ে সে স্থান দখল করবে এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া। আর মনে করা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত যুক্তরাষ্ট্রকেও হটিয়ে দেবে। তবে তখনো চীনই থাকবে সবার ওপরে।

জুন মাস চলে গেছে বেশ আগে। কিন্তু এখন পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী জুন পর্যন্ত সময়ের নানা হিসাব। বিভিন্ন দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতির ভালোই ক্ষতি করেছে এবং করছে।

সর্বশেষ তথ্য এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। তাতে দেখা যাচ্ছে দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। তবে বার্ষিক হিসাব ধরলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সংকুচিত হবে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি যে খারাপ তা নয়, অন্য দেশগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। যেমন জার্মানি জানাচ্ছে জানুয়ারি-মার্চ সময়ের তুলনায় এপ্রিল-জুন সময়ে তাদের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ। আর তাতে তাদের জিডিপি কমেছে ২ শতাংশ। এপ্রিল-জুন সময়ে জার্মানির চেয়েও খারাপ অবস্থা হয়েছে ইতালি, ফ্রান্স ও কানাডার।

বছরের প্রথম তিন মাস (জানুয়ারি-মার্চ) সময়ে চীন ছিল করোনোভাইরাসে প্রবলভাবে আক্রান্ত। এ সময় তাদের অর্থনীতি সংকুচিত হয় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হারে। তবে করোনোর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসায় দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) চীন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাতে মনে করা হচ্ছে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমনটি বলা যাচ্ছে না। কারণ, তারা এখনো মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া মহামারির প্রাদুর্ভাবে টানা লকডাউনে যায়নি। তারপরও দেশটি খুব ভালো আছে বলা যাবে না। প্রথম প্রান্তিকে তাদের অর্থনীতি সংকুচিত হয় ১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে।

মুনাফা কমছে সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানির

বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানির নাম কী? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে ফরচুন গ্লোবাল ৫০০। গত ১০ আগস্ট তারা তথ্য দিয়ে বলেছে সৌদি আরবের তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো এখনো বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানি। তবে এই অবস্থান তারা কত দিন ধরে রাখতে পারবে, এ নিয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছে ফরচুন গ্লোবাল ৫০০। বিভিন্ন কোম্পানির দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

সৌদি আরামকো শেয়ারবাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ২০১৮ সালে প্রথম তাদের মুনাফার তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করে। তখন তাদের মুনাফা ছিল ১১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এই মুনাফা অন্য যেকোনো কোম্পানির তুলনায় ছিল অনেক বেশি। তবে ২০১৯ সালের শেষের দিকে তারা তালিকাভুক্ত হয়েছে। এখন তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সৌদি আরামকোর মুনাফা অনেক কমে হয়েছে ৮৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এরপরও তারা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানি। মূলত তেলের দাম কমে যাওয়া এবং ওপেকের সঙ্গে ঝগড়ার পরিণাম এটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সামনে তাদের মুনাফা আরও কমতে পারে।

সৌদি আরামকো পিছিয়ে পড়ায় সামনে এগিয়ে আসছে ওয়ারেন বাফেটের বিনিয়োগ কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে ও অ্যাপল। ২০২০ সালের করোনোভাইরাসের মধ্যেই তাদের মুনাফা বেড়েছে। বলে রাখা ভালো, মুনাফার তথ্য পাওয়া যায় কেবল তালিকাভুক্ত কোম্পানির। যারা তালিকাভুক্ত নয়, তাদের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই। মনে করা হয়, এ রকম আরও অনেক কোম্পানি আছে, যারা বিপুল মুনাফা করলেও তা জানা যাচ্ছে না।

রোনার বড় আঘাত এশিয়ার প্রবাসী আয়ে

করোনাভাইরাসে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, আয় কমে গেছে বড় এক জনগোষ্ঠীর। আর এ কারণে অনেক দেশ রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাওয়ার দিক থেকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সংকটে আছে এশিয়ার অনেক দেশ, যারা প্রবাসী আয়ের ওপর অনেক বড়ভাবে নির্ভরশীল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) গবেষকেরা বলছেন, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক দেশগুলোতে প্রবাসী আয় কম পাবে ৫৪ বিলিয়ন ডলার। সামগ্রিকভাবে কমবে ২০ শতাংশ। আর এশিয়া-প্যাসিফিকের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। যেমন নেপালের কমবে ২৯ শতাংশ আর ভারতের ২৩ শতাংশ। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হার হবে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

এমনিতেই অনেক প্রবাসী শ্রমিকের জন্য কাজের পরিবেশ ভালো নয়, তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা নেই। আর করোনাভাইরাসের মতো মহামারি তাঁদের সংকট আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকেই কাজে যোগ দিতে পারেননি, ঘরে বন্দী থাকতে হয়েছে, দেশে ফিরে আসতেও হয়েছে অনেককে।

এমনিতেই বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত বলছে, এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বড় প্রবাসী আয় পাওয়া দেশ। সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় পায় ভারত, তারপরই চীন। তৃতীয় স্থানে থাকা মেক্সিকোর পরই আছে ফিলিপাইন। ফিলিপাইন ২০১৮ সালে মোট প্রবাসী আয় পেয়েছে ৩৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০ শতাংশ। এরপরই আছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। এর মধ্যে পাকিস্তানের পাওয়া প্রবাসী আয় ২১ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৭ শতাংশ। আর বাংলাদেশের আয় ১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। তবে নির্ভরশীলতার দিক থেকে সবার ওপরে নেপাল। তাদের প্রবাসী আয় দেশটির জিডিপির ২৭ শতাংশের সমান। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও প্রবাসী আয়ের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।

এশিয়ার দেশগুলো প্রবাসী আয় সবচেয়ে বেশি পায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এরপরই আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। এর মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো অনেকাংশেই প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। নির্মাণ খাতেই প্রবাসীরা বেশি কাজ করেন। এরপরই আছে পোশাক খাত ও গৃহকর্ম। এসব দেশের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে, তেলের দাম কমে গেছে, কাজের আদেশ পাচ্ছে কম। ফলে কাজ হারাচ্ছেন প্রবাসীরা, ফিরে যেতে হচ্ছে নিজ নিজ দেশে। আর এতেই কমে যাচ্ছে প্রবাসী আয়। ফলে অর্থনীতি নিয়ে বিপদেই পড়তে যাচ্ছে প্রবাসী আয়–নির্ভরশীল দেশগুলো।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English