শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ন

ভ্যাকসিন পেতে ‘সব পথ খোলা’ রেখেছে বাংলাদেশ

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০
  • ৫৬ জন নিউজটি পড়েছেন

বেশি কিছুদিন ধরে আলোচনার পর সম্প্রতি চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে সরকার। সবশেষ শুক্রবার ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটি অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিটিক্যাল। সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান।

শুধু এই দুটি নয় চূড়ান্ত পর্যায়ে পরীক্ষায় থাকা এবং সম্ভাবনাময় সবগুলো ভ্যাকসিন পরীক্ষার জন্যই পথ খোলা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমান উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ভ্যাকসিন পেতে সরকার সব পথই খোলা রেখেছ। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল যারাই দিতে চাচ্ছে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। এগুলোর কোনটি যদি সফল হয় তাহলে তো খুবই ভালো। বিশেষ করে বিনা পয়সায় বা কম মূল্যে যদি পাওয়া যায় সেই চেষ্টা করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাতটি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন এখন তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে রয়েছে। এর বাইরে সম্প্রতি রাশিয়া তাদের ভ্যাকসিন কার্যকর দাবি করে তার অনুমোদন দিয়েছে। যদিও দেশটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার কোন তথ্য প্রকাশ করেনি। সরকার ভ্যাকসিন আবিস্কারের পথে এগিয়ে থাকা সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে বলে দাবি করেন ডা. মুশতাক। তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিকভাবেও সরকার চেষ্টা করছে। যেমন ধরেন রাশিয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যে নেই। কিন্তু তাদের ভ্যাকসিন পেতেও সরকার যোগাযোগ রাখছে। আসলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়েল যারা করবে তারাই সুবিধা পাবে। সবগুলো অপশনই খোলা আছে। আসলে আমরা তো জানি না, কার্যকর ট্রায়াল কোনটা হবে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়েল ভালো এই কারণে যে, ওই টিকা কার্যকর হলে তখন আমাদের আর ট্রায়াল করতে হবে না। নতুবা বাইরের কোন টিকা আমরা নিলে সেটা ট্রায়াল করেই দিতে হয়।

তিনি জানান, এক দেশের জন্য ভ্যাকসিন নিরাপদ হলে অন্য দেশে তা নাও হতে পারে। ফিলিপাইন্সে পরীক্ষা ছাড়াই শিশুদের উপর একটি টিকা প্রয়োগের পর অনেকে মারা গিয়েছিল। ডা. মুশতাক বলেন, ওই টিকা কিন্তু আমাদের দেশেও প্রয়োগ করার কথা ছিলো৷ কিন্তু ফিলিপাইনের ঘটনার পর দ্রুত সেটা বাতিল করা হয়।

সর্বশেষ শুক্রবার সেরাম ইনস্টিটিউটি অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিটিক্যাল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করা টিকার পরীক্ষা ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেরাম ইনস্টিটিউটি। বর্তমানে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতে কোভিশিল্ড নামের ওই টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে। এই টিকার ১০০ কোটির বেশি ডোজ উৎপাদন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরবরাহের জন্য এসআইআই ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার এবং গেটস ফাউন্ডেশন ও গ্যাভির সঙ্গে আংশীদারিত্বে পৌঁছেছে।

বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে এটা নিশ্চিত হয়ে গেল, বাংলাদেশেও এই ভ্যাকসিনগুলো আমরা আনতে পারব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আগে থেকে ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য ‘বুকিং’ দিয়ে রাখছে। এখন বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এই ভ্যাকসিনগুলো বাংলাদেশে আনতে পারবে, সেটাই এই চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হল। এখন যেটা আমাদেরকে ওদের সাথে নেগোশিয়েট করতে হবে যে কত কোয়ানটিটি আনব, কী প্রাইসে আনব, প্রাইভেট সেক্টরের জন্য কী প্রাইস হবে, সরকারের জন্য কী প্রাইস হবে। ওরা তো বলেছে, ডিসেম্বরের শেষে বা জানুয়ারিতে লঞ্চ করবে। যে টিকাগুলো দিয়ে লঞ্চ হবে সেই টিকারও একটা অংশ আমরা পাবো। এটা এই চুক্তির মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয়েছে।

শুক্রবার বেক্সিমকোর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন যখন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাবে, তখন যেসব দেশ সবার আগে নির্দিষ্ট পরিমান ভ্যাকসিন পাবে, সেই তালিকায় বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্ত করবে এসআইআই। এসআইআই-এর উৎপাদন সক্ষমতা ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ববর্তী অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের বিনিয়োগের পরিমাণ এবং বাংলাদেশের জন্য এসআইআই-এর অগ্রাধিকারমূলক ভ্যাকসিন সরবরাহের পরিমাণ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, বাংলাদেশ ভ্যাকসিন পাওয়ার সবগুলো পথই খোলা রেখেছে। আমরা তো এখনো নিশ্চিত নই, যে কোন ভ্যাকসিনটি আসলে কার্যকর হবে। ফলে সরকারিভাবে ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভ্যাকসিন আসলে কিভাবে ডিস্ট্রিবিউশন হবে তারও একটা চ্যানেল আমরা ঠিক করে ফেলেছি। আমরা কিন্তু বসে নেই৷ ভ্যাকসিন পাওয়ার সব ধরনের চেষ্টাই আমাদের অব্যহত রয়েছে।

চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির তৈরি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়ালের অনুমোদন দিয়েছে সরকার৷ তবে চীনা ভ্যাকসিনের এই ট্রায়াল কবে নাগাদ হতে পারে, সে বিষয়ে এখনও কিছুই জানানো হয়নি৷ জানা গেছে, চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাক রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশে তাদের টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি)৷

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, বাংলাদেশ সঠিক পথেই আছে বলে মনে হচ্ছে। চীনের ভ্যাকসিনের ট্রায়েলের অনুমতি তো দিয়েছে। এটা ভালো এই কারণে যে কয়েক হাজার লোক পাবে। পাশাপাশি এই ভ্যাকসিনটা কতটুকু কার্যকরী বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি-না এগুলো বুঝতে পারবো। চীনের লোকজনের পাশাপাশি আমাদের লোকজনও থাকবে। ফলে তাদের একটা অভিজ্ঞতাও হবে। সরকার চাইলে আরেকটা কাজ করতে পারে। অনেক দেশই তো ভ্যাকসিন তৈরী করছে। আরো কোন দেশ যদি ট্রায়াল দিতে চায় তাদেরও অনুমতি দিতে পারে। তবে আমরা যখন ফাইনালি নেবো তখন যাচাই করে নেবো যেটা সবচেয়ে ভালো সেটাই যেন আমরা পাই। এটা যেন জনগনের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত বিশ্বে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের ১৭০টির বেশি উদ্যোগ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ১৩৯ টি এখন ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তিনটি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ২৫টি ভ্যাকসিন। দ্বিতীয় ধাপে ১৫ টি আর পরীক্ষার সবশেষ ধাপে আছে সাতটি। সেগুলোর মধ্যে চীনেরই রয়েছে তিনটি ভ্যাকসিন। এছাড়াও চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা চালাচ্ছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না ও ফাইজার। আর সবকিছু নির্ভর করছে হিউম্যান ট্রায়ালের রেজাল্টের ওপর। তাই সবাই প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বলেছেন, বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের অনুপাতে কিছু ভ্যাকসিন ফ্রি পাবে। তবে সরকার কেবল ফ্রি ভ্যাকসিন পেতেই বসে থাকবে না। সরকার ভ্যাকসিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকবে না।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English