রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:১৯ পূর্বাহ্ন

কম সুদে তহবিল জোগাবে বাংলাদেশ ব্যাংক

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০
  • ৪৪ জন নিউজটি পড়েছেন

ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি কম সুদে তহবিল জোগান দেবে ব্যাংকটি। একই সঙ্গে বিভিন্ন উৎস থেকে কম সুদে তহবিলের জোগান বাড়ানো হবে। আর এ প্রক্রিয়ার কমে যাবে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) সূত্র জানায়, তারা বিষয়টিকে ইতিবাচক ভাবে দেখছে। ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কমানো হলে গ্রামের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবে। ব্যবসা খরচ কমে যাবে। গ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়বে। এতে করে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে।

সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থ ও সদস্যদের আমানত দিয়ে। এর বাইরে বড় ধরনের কোনো তহবিল নেই। আগে বিদেশি তহবিল থাকলেও এখন তেমন একটা নেই। মোট তহবিলের ১ শতাংশেরও কম বিদেশি অনুদান থেকে আসে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব তহবিল ও মুনাফা থেকে অর্জিত অর্থ তারা পুনরায় বিনিয়োগ করে। এ তহবিলের ব্যয় কম। অন্যদিকে সদস্যদের কাছ থেকে যেসব আমানত সংগ্রহ করা হয় সেগুলোর বিপরীতে ৬ থেকে ৮ শতাংশ সুদ দিতে হয়। এছাড়া ক্ষুদ্রঋণে বাড়তি তদারকির কারণে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি। এতে করে সুদের হার বেড়ে যায়। আগে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। ২০০২ সালে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুদের হার সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ বেঁধে দেয়। এ হার শুধু পিকেএসএফের সদস্য ২০২টি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করা হয়। অন্যদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ছিল না। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি একটি সার্কুলারের মাধ্যমে সব ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জ সব খাতে ২৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৪ শতাংশ নির্ধারণ করে। ফলে সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সুদের হার দাঁড়ায় ২৪ শতাংশ।

এ হার আরও কমানোর জন্য সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলা করার জন্য সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ১ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে। ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেবে সাড়ে ৩ শতাংশ সুদে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করবে ৯ শতাংশ সুদে। ইতোমধ্যে এ তহবিলের আওতায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মাঠপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ঋণ বিতরণ করছে বেশ উৎসাহ নিয়ে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ তহবিলের আকার আরও বাড়াতে আগ্রহী। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ না দিয়ে সরাসরি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করতে চায়। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে এমআরএর সরাসরি চলতি হিসাবে লেনদেন চালু করার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি চলতি হিসাবে লেনদেন করতে পারে না। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোটা অংকের তহবিলের জোগান দেয়া সম্ভব হলে সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যেই নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, গ্রামে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করতে চায় না। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামে ব্যাপক হারে ঋণ বিতরণ করে। গ্রামীণ অর্থ প্রবাহের ৮০ শতাংশই যায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। ফলে এর সুদের হার কমলে গ্রামের মানুষ উপকৃত হবে। তবে সমস্যা হচ্ছে, অনেকে চায় না ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কমুক। ফলে সব কিছু এক জায়গায় গিয়ে আটকে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, ক্ষুদ্রঋণে তহবিলের জোগান বাড়াতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এনজিওদের একটি লিংকেজ ঋণ প্রোগ্রাম চালু হয়েছিল। এর আওতায় ব্যাংকগুলোর কম সুদে ঋণ দিত এনজিওদের। এনজিওগুলো সেগুলো কম সুদে মাঠপর্যায়ে বিতরণের শর্ত ছিল। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও তহবিলের জোগান দেয়া হতো। কিন্তু প্রকল্পটি এগোয়নি। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাচ্ছে সরাসরি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে তহবিলের জোগান দিতে। কেননা তারা এখন একটি প্রতিষ্ঠানিক তদারকির আওতায় চলে এসেছে।

এমআরএর নিবন্ধন নিয়ে মাঠপর্যায়ে এখন ৮০০ প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে। প্রতি মাসে তারা গড়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে। এর ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আদায় হয়। এ হিসাবে মাসে ১১ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ আদায় হয়।

এ প্রসঙ্গে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির পরিচালক ও করোনায় ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইয়াকুব হোসেন বলেন, কম সুদে তহবিলের জোগান পাওয়া গেলে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হারও কমানো সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু ক্ষুদ্রঋণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা মাঝারি আকারের ঋণও দিচ্ছে।

সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে তহবিলের জোগান দিতে এখন ৪০ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। এ টাকা দিয়ে ২ থেকে ৩ মাস ঋণ বিতরণ করা গেলে পরে কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে নতুন ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া চলমান রাখা সম্ভব হবে।

জানা যায়, ২০২টি প্রতিষ্ঠানকে তহবিলের জোগান দেয় পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। তারা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে সরকারের কাছে চেয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত সরকার দিয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের কাছে ৮৫০ কোটি টাকা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্টের (ইফাদ) কাছে চেয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। সম্প্রতি এডিবি ও ইফাদের কাছ থেকে তারা কিছু অর্থ পেয়েছে। এসব অর্থে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে পিকেএসএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের বলেন, কম সুদে তহবিল পাওয়া গেলে কম সুদে বিতরণও করা যাবে। অনেক বাধা অতিক্রম করে পিকেএসএফই প্রথম এ খাতে সুদের হার কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে।

সূত্র জানায়, পিকেএসএফ এখন পর্যন্ত তার সদস্য সংস্থাগুলোকে ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিলসহ মাঠে রয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। প্রায় দেড় কোটি পরিবারকে ১০ হাজার শাখার মাধ্যমে তারা নানাভাবে সহায়তা করে আসছে।

১ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বৈদেশিক ঋণ দিচ্ছে ১ থেকে ২ শতাংশ সুদে এবং স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দিচ্ছে ২ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English