শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই রাসায়নিক দ্রব্যের অস্থায়ী গুদাম নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। মার্চের শুরুতেই করোনা মহামারী এবং ঢাকার পোস্তগোলায় মেরিন ওয়ার্কশপ তৈরির নির্ধারিত স্থানের পাশে হওয়াতে সেনাবাহিনীর আপত্তির কারণে কাজ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। ওখানে গোডাউন নির্মাণ করা হলে মেরিন ওয়ার্কশপসহ সেনানিবাস, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে বিসিআইসির বিষয়টি পর্যালোচনা বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সঠিকভাবে করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল। সশস্ত্রবাহিনীর সাথে আলোচনা করেই প্রকল্পটি নেয়া প্রয়োজন ছিল।
ঢাকার কদমতলীর শ্যামপুরে ‘অস্থায়ী ভিত্তিতে রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণের জন্য গুদাম নির্মাণ’ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দেয়। আর এটি বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয় ৭৯ কোটি ৪১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে রাসায়নিক দ্রব্যাদি নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা, পুরনো ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত রাসায়নিক পদার্থগুলো দ্রুত স্থানান্তর করে নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য গুদাম নির্মাণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের নিরাপদ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারবে বলে প্রস্তাবনায় জানিয়েছিল। কিন্তু করোনা মহামারী এবং পরবর্তীতে মেরিন ওয়ার্কশপের নির্ধারিত স্থানের পাশে এটি হওয়াতে ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে সেনাবাহিনীর আপত্তিতে আপতত প্রকল্পের কাজ বন্ধ আছে বলে সম্প্রতি শিল্প সচিবের সভাপতিত্বে পর্যালোচনা সভায় প্রকাশ করা হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রকল্প পরিচালক স্টিয়ারিং কমিটির প্রথম সভায় জানান, ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ওয়ার্কস লিমিটেডের সাথে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মতি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১ ডিসেম্বর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটিকে ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়। ২৪ ডিসেম্বর সাইট বুঝিয়ে দেয়া হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি তাদের মোবিলাইজেশন, ফেন্সিং ও ক্লিনিং কার্যক্রম শুরু করে। প্রকল্পের আওতায় ৫৪টি গুদাম নির্মাণ করা হবে। তবে ১ লাখ গ্যালন ধারণক্ষমতার একটি আন্ডার গ্রাউন্ড পানির ট্যাংক নির্মাণ, দু’টি ইটিপি স্থাপন, ৯টি ফায়ার হাইড্রান্টসহ স্বয়ংক্রিয় অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন, ৩০টি সিসি ক্যামেরা ও অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন, এক লাখ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ওভারহেড পানির ট্যাংক ইত্যাদি কার্যক্রম এই প্রকল্পের আওতায় ছিল’।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যান ও ড্রয়িং-ডিজাইন মোতাবেক প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলছিল। এখানে ৫৪টি গুদামের মধ্যে ২২টির কাজ চলমান ছিল। কিন্ত গত ৮ মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড মার্চের শেষ নাগাদ নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে গত ৭ মে ডকইয়ার্ড বিসিআইসিকে একটি চিঠি দেয়। ওই চিঠির সাথে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের একটি পত্র সংলগ্নী হিসেবে প্রেরণ করে।
সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পোস্তগোলা সেনানিবাসের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী যে স্থানে মেরিন ওয়ার্কশপ তৈরি করার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন, ঠিক তার পাশে গোডাউন তৈরি করা হলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যর জন্য হুমকি স্বরূপ। যা সেনানিবাস আইন ২০১৮ এর ধারা ৯৬ (ধ) অনুযায়ী সেনানিবাস আইন পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হয়। তাই তাদের অনুরোধে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পুরান ঢাকা ঐতিহ্যবাহী ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। অনেক দিন ধরেই এ এলাকার অনেক বাড়ি রাসায়নিক পদার্থের কারখানা ও গুদাম হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক পদার্থের গুদাম থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পুরনো ঢাকার বাসিন্দারা একাধিকবার এ কারণে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১০ সালে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড এবং বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড অন্যতম।
পুরান ঢাকার কেমিক্যাল কারখানা নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে ইতোমধ্যেই সরকার বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মাধ্যমে বৈধ কেমিক্যাল কারখানা এবং কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের জন্য স্থায়ী কারখানা ও গুদাম নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দ্রুততম সময়ে বিদ্যমান বৈধ ব্যবসায়ীদের বিপজ্জনক কেমিক্যাল কারখানা সাময়িকভাবে কেমিক্যাল সংরক্ষণের জন্য বিসিআইসির আওতায় ঢাকার শ্যামপুরে উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে গুদাম নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি জরুরি ভিত্তিতে সমাপ্ত করার জন্য সশস্ত্রবাহিনীর সাথে আলোচনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি প্রকল্পটি সমাপ্ত করার জন্য আরো দেড় বছর বাড়তি সময় চাওয়া হয়েছে।
বিসিআইসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে কোনো কেমিক্যাল তৈরি করা হবে না। ব্যবহারও করা হবে না। পুরনো ঢাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রাসায়নিক দ্রব্যাদির একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দ্রুত স্থানান্তরের নিমিত্তে সরকার জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্পটি হাতে নেয়। বিসিক কর্তৃক মুন্সীগঞ্জে স্থায়ী কেমিক্যাল পল্লী নির্মাণকাজ প্রক্রিয়াধিন আছে। ওই পল্লী নির্মাণ হলেই সেখানে এসব স্থানান্তর করা হবে।