রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৩৯ অপরাহ্ন

দুদকের মামলা : জামিন নিয়ে আসামিরা হাওয়া

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪৫ জন নিউজটি পড়েছেন

দেশে গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাতে আলোচিত কয়েকটি বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক অন্যতম। ব্যাংক কেলেঙ্কারির কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, মামলা দায়েরের পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও তদন্ত শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব কেলেঙ্কারির তদন্ত কবে শেষ হবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

যদিও দুদক আইনে প্রতিটি মামলার তদন্ত সর্বোচ্চ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। এ নিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে উচ্চ আদালত। এ অবস্থায় দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত নিয়ে জনমনে নানা সন্দেহের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও একাগ্রতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।

দুদক আইনে মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা সময় পান ১২০ কর্মদিবস। পরে এটি আরো ৬০ কর্মদিবস বাড়ানোর সুযোগ আছে। তবে তদন্তের ব্যাপকতা ও জটিলতা বিবেচনায় বাড়তি সময় দেয়ারও রীতি রয়েছে। আইনে আছে, সাধারণত সর্বোচ্চ ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে কর্মকর্তা তদন্ত শেষ করতে না পারলে কমিশন নতুন একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে। নতুন কর্মকর্তাকে ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যাংক খাতের শতাধিক মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রায় ১০ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় নেয়া হয়েছে। এরপরও তদন্ত শেষ করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি : বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৫৬টি এবং পরের বছর আরো পাঁচটি মামলা করে দুদক। ৬১টি মামলায় মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তা, ১১ জরিপকারী ও ৮২ ঋণগ্রহীতা রয়েছেন। এসব মামলা করার পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে একটি মামলারও চার্জশিট দাখিল করেনি সংস্থাটি। শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করার কোনো সম্ভাবনাও নেই বলে জানা গেছে। এসব মামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বর্তমানে সবাই হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এখন কারাগারের বাইরে। এছাড়া আসামিদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারীর মামলার কয়েকজন আসামির জামিন প্রশ্নে রুল শুনানিকালে উচ্চ আদালত ২০১৮ সালের ৩০ মে এসব মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন। আদালত বলেছেন, আপনাদের কথা শুনে লজ্জায় কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলতে ইচ্ছে করছে। দুদকের আইনজীবীর বক্তব্যের মধ্যেই আদালত তাকে বলেন, চার্জশিট দিচ্ছেন না কেন? এ ধরনের মামলায় আড়াই বছর লেগে গেল? তাহলে কেমনে হবে? উচ্চ আদালতের এই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশের পর আরো আড়াই বছর পার হলেও তাতেও কোনো কাজ হয়নি। টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের। আসামিদের সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশ প্রসঙ্গে তখন আদালত বলেছেন, আপনাদের নির্লিপ্ততার কারণে যেসব আসামি ভেতরে আছে তারাও বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে আপনাদের সখ্য আছে বলে মনে হচ্ছে। চার্জশিট দিতে দেরি করছেন, যাতে আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। আমরাও তাদের জামিন দিতে বাধ্য হচ্ছি।

এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বলেন, বেসিক ব্যাংক মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূলত আমরা টাকার উৎস ও গন্তব্যের সন্ধানে আছি। এটি খুঁজতে গিয়েই আমাদের বিলম্ব হচ্ছে। তাই আরো সময় লাগবে। তদন্ত শেষ হলে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে মামলাগুলোর তদন্ত কবে শেষ হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।

ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি : বেসিক ব্যাংকের মতো ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা) ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় করা ১৪টি মামলার তদন্ত গত আড়াই বছরেও শেষ করতে পারেনি দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন সংস্থাটি। কবে চার্জশিট দেয়া হবে, তাও জানাতে পারছেন না কেউ। মামলাগুলো করেন দুদকের উপপরিচালক শামসুল আলম। ২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক কার্যক্রমের শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। পরে অনুসন্ধান শেষে ব্যাংকটির অডিট ও ইসি কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক ওরফে বাবুল চিশতী ও তার ছেলে রাশেদ চিশতীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েক ব্যাংকারের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ১৬টি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে দুটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। যদিও এ দুটি মামলাও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই ঝুলে রয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি ১৪টি মামলায় আড়াই বছর সময় নিয়ে তদন্ত চালিয়েও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রাশেদ চিশতী করোনার সময়ে ভার্চুয়াল আদালতের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব মামলায় জামিন নিয়েছেন। যদিও জামিন পাওয়া সব আদেশের বিরুদ্ধেই উচ্চ আদালতে আপিল করেছে দুদক।

জনতা ব্যাংক কেলেঙ্কারি : রপ্তানি না করেও ভুয়া রপ্তানি বিলের মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ২২ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা, জাল কাগজপত্র তৈরি করে জালিয়াতি, পরস্পর যোগসাজশ, প্রতারণায় সহায়তা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়। এ মামলাগুলোতে জনতা ব্যাংকের ১৫ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। এছাড়া ঋণ নেয়া ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠানটির চারটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ৭ জনকে আসামি করা হয়। এই জালিয়াতিকে দুদক বলছে, জনতা ব্যাংকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ ডাকাতি। অথচ এই ঋণ ডাকাতির মামলা হওয়ার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তদন্ত শেষ করতে পারেনি স্বাধীন সংস্থাটি।

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কয়েকটি ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদকের দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্র সঠিক সময়ে দিতে না পারাটা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। এটা দুদকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে। দুদক কারো চেহারা দেখে তদন্ত করবে না। দুদক একটি শক্তিশালী স্বাধীন সংস্থা। আইনেই তাদের সেই ক্ষমতা দেয়া আছে। তাদের সেই সৎ সাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত ব্যার্থতার বিড়ম্বনা, দক্ষতার ঘাটতি, সদিচ্ছার অভাব ও সৎ সাহসিকতার ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। ব্যাংকিং খাতে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে এই খাতে স্বচ্ছতা ও আস্থা ফেরাতে হলে এই মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এই মামলাগুলোর আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দুদক সেই প্রমাণ রাখতে পারে। অন্যথায় বছরের পর বছর তদন্ত চলতে থাকার সুযোগে আসামিরা জামিন নিয়ে গা ঢাকা দিচ্ছে অথবা পালিয়ে যাচ্ছে। যা পরবর্তীতে আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

এ বিষয়ে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাতে ডাকাত পড়েছে। বর্তমানে আমানতকারীরা ব্যাপক আতঙ্কের মধ্যে আছে। এ ডাকাতদের যারা আইনের আওতায় আনবেন, তারা সঠিকভাবে কাজ করছেন কিনা আমার জানা নেই। বেসিক ব্যাংকে টর্নেডো বয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল ব্যক্তিরাই তো মামলার বাইরে রয়ে গেছে। কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তা আমাদের অজানা। বেসিক ব্যাংকের মামলায় ৬ মাসের জায়গায় পাঁচ বছরেও চার্জশিট দিতে না পারাটা খুবই হতাশার জানিয়ে ড. মজুমদার বলেন, তদন্তের জটিলতার কারণে যদি কিছুটা সময় লাগে, তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এসব মামলার আসামিদের মধ্যে তো অনেক ক্ষমতাবানরা রয়েছেন। যদি তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের কারণে সময়ক্ষেপণ হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে দুদক তার সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা ফেরাতে মামলাগুলোর দ্রুত চার্জশিট দিয়ে বিচার ত্বরান্বিত করা দুদকের দায়িত্ব। আশা করি প্রতিষ্ঠানটি তাদের সেই দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করবে।

এ বিষয়ে কথা বলতে দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইলে কল দিলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। ফলে এসব বিষয়ে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English