বিয়ের কিছুদিন পর আমার মাকে বাবা একটি কোরআন শরিফ কিনে দিয়েছিলেন। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে। এখনও সুন্দর পরিপাটি কোরআনটি। মা প্রতিদিন নিয়ম করে পড়তে বসেন।
সেদিন দেখি, মাদ্রাসার ঘাটে নৌকার মধ্যে ৮-১০ বস্তা কোরআন তোলা হয়েছে। একজনকে বললাম, বস্তায় কী? বললেন, কোরআন শরিফ। কী বলেন? হুম, অনেক বছর ধরে অফিসের পাশের রুমে কোরআন শরিফগুলো বস্তাবন্দি ছিল।
কথাটা মানতে পারছিলাম না। ভেতরটা ভীষণ হাহাকার করে উঠল। মাদ্রাসার মানুষরা কি কোরআন পড়ে না? মুসলমানদের প্রাণের গ্রন্থ কেনই বা বস্তাবন্দি থাকবে? আর সেটি যদি হয় মাদ্রাসায় তাহলে আফসোসের সীমা থাকে না।
আমার দেখা প্রায় বহু মসজিদ-মাদ্রাসার কোরআন শরিফের এমন করুণ দুরবস্থা দেখেছি। অবহেলা আর অনাদরে পড়ে আছে। পাঠক নেই। যত্নের লোক নেই।
ধুলো সরানোর মানুষ নেই। ভালোবেসে মলাট বা গিলাফবদ্ধ করতে কর্তৃপক্ষের সময় সুযোগ নেই। কাগজে কাঁদে কোরআনের হরফ।
একদিন এক মাদ্রাসায় গেলাম কোরআনের খোঁজে। বন্ধুকে নিয়ে ঢুকলাম মাদ্রাসার পাঠাগারে। দেখলাম, ঘরের কোনা ভর্তি সাদা বস্তা। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এগুলোতে পুরনো সব কোরআন শরিফ রাখা হয়েছে। যেগুলোর অধিকাংশই ছেঁড়া।
আমি এক আধুনিক চকচকে মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি। মসজিদের মেঝে, দেয়াল, ফ্যান ও এসি ঝকঝকে পরিষ্কার। খাদেম চাচা প্রতি নামাজের সময় মেঝে ধোয়ামোছার কাজ করেন। কিন্তু কোনোদিন তাকে রাখা কোরআন শরিফের গায়ে হাত বুলাতে দেখিনি। ধীরে ধীরে সেখানে ময়লা জমছে।
গ্রামে আমার এক বন্ধু ছিল। গরিব ঘরের। তার প্রতি তার মায়ের প্রচণ্ড রকম দরদ ছিল। ছেলেকে সবসময় চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। ছেলের ব্যাপারে চুন থেকে পান খসলেই মসজিদে কোরআন শরিফ মানত করতেন।
জিজ্ঞেস করলাম, কোরআন কেন মানত করেন? বলেন, বাবারে আমরা গরিব মানুষ। কোরআন আল্লাহর কিতাব। এর ভেতরে আল্লাহর কথা আছে। কোরআন থাকলে আল্লাহ হেফাজত করে।
হায়! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ মানুষের মানতের উপকরণ হয়ে গেছে। তার পাঠ নেই। গবেষণা নেই। আমল নেই। হে আল্লাহ! কবে মুসলমানকে কোরআন গবেষণার তৌফিক দেবেন?