রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন

দায়ীরা সবাই চিহ্নিত সহসাই চার্জশিট

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৫৬ জন নিউজটি পড়েছেন

রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ১৭ মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, তদন্তকাজ শেষের দিকে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় দায়ীদের সবারই নাম বেরিয়ে এসেছে। যার মধ্যে মামলার নামধারী ৩ আসামি এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে। তদন্ত কাজ শেষ হলেও ফায়ার সার্ভিস ও গণপূর্তের কাছে চাওয়া মতামত না পাওয়ার কারণে চার্জশিট দেয়া যাচ্ছে না। সংস্থা দুটির মতামত পেলে ১ মাসের মধ্যে চার্জশিট দেয়া হবে।

ডিবির একাধিক সূত্র জানায়, তদন্তে মামলায় নাম উল্লেখ থাকা ৩ আসামি ফারুক, লিয়াকত, তাজভিরুলসহ আরো বেশ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। যার মধ্যে রাজউকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা রয়েছেন। যারা ১৮ তলার উপর থেকে ২৩ তলা পর্যন্ত বর্ধিতকরণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

ডিবির একটি সূত্র জানায়, চার্জশিটে রাজউকের কর্মকর্তাদের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান কে এ এম হারুন, সাবেক পরিচালক মো. শামসুল আলম, তত্ত্বাবধায়ক মো. মোফাজ্জল হোসেন, সহকারী পরিচালক শাহ মো. সদরুল আলম, সাবেক প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. মাহবুব হোসেন সরকার ও সাবেক ইমারত পরিদর্শক মো. আওরঙ্গজেব সিদ্দিকীর নাম উঠে আসতে পারে।

সূত্র জানায়, মামলার তদন্তে নেমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ১৯-২৩ তলা বর্ধিত করার জন্য একটি ব্যাংকে ঋণের আবেদন করা হয়েছিল। তখন ব্যাংক থেকে রাজউকের অনাপত্তি পত্র (এনওসি) চাওয়া হয়। রাজউক তাদের অবৈধভাবে এনওসি দেয়। এছাড়া রাজউকের ভবন পরিদর্শন টিমের চরম গাফিলতি পেয়েছে ডিবি।

নামপ্রকাশ না করার শর্তে ডিবি গুলশান বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর রাজউকের পক্ষ থেকে সংস্থাটির তখনকার পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) খন্দকার অলিয়ার রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে অলিয়ার রহমান কোনো সহযোগিতা করেননি। অসহযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমানে বিআরটিএ-এর সচিব খন্দকার অলিয়ার রহমান বলেন, এ বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে তার কোনো কথাই হয়নি। তদন্তে কি কি গাফিলতি পেয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে সব ভুলে গেছেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় আমরা অবহেলাজনিত বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ইতোমধ্যে আমরা তদন্ত কাজ প্রায় গুছিয়ে নিয়ে এসেছি। তবে, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করা আমাদের দায়িত্ব। এজন্য সঠিক নকশায় ভবনটি তৈরি করা হয়েছে কিনা, অবৈধ ফ্লোরগুলো কাদের ইন্ধনে গড়ে তোলা হয়, ফায়ার ইক্যুইপমেন্ট ঠিক ছিল না এ বিষয়গুলো জানা খুব জরুরি। এজন্য আমরা ফায়ার সার্ভিস ও গণপূর্তের মতামতের অপেক্ষায় আছি। এগুলো পেলে খুব কম সময়ে আমরা চার্জশিট দাখিল করব। তবে, আমাদের তদন্তে ইতোমধ্যেই জড়িত সবার নাম বেরিয়ে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই নামগুলো বলা সম্ভব হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মৃতদেহের সবগুলো ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেয়েছি। তদন্তের অন্যান্য সব দিকও প্রায় শেষ।

দুদকের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৫ জনকে আসামি করে দুদকের করা দুটি মামলার একটিতে ৫ জনকে অভিযুক্ত করে গত বছরের ২৯ অক্টোবর চার্জশিট দেয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন ফারুক, লিয়াকত, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ূন খাদেম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান ও সাবেক অথোরাইজড অফিসার সৈয়দ মকবুল আহমেদ। অন্য মামলাটির তদন্তও শেষ পর্যায়ে। দ্রুতই ওই মামলাটির চার্জশিট দেয়া হবে।

ভবনের পোড়া ক্ষতে ধ্বংসলীলার স্মৃতি : শোকের মূর্ত প্রতীক হয়ে পোড়া ক্ষত নিয়ে এখনো ধ্বংসলীলার স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে ২৩ তলার অট্টালিকা এফ আর টাওয়ার। ভবনটির সামনে ও পেছনের অংশে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলেও ভেতরে সুনসান নীরবতা। তালাবদ্ধ অবস্থাতেই রয়েছে প্রধান ফটক। এখন আর পথচারীরা অবাক চাহুনিতে ভবনটির দিকে তাকিয়ে থাকে না। নেই পুলিশ প্রহরাও। কিন্তু সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা অনেকেই ভবনটির সামনে এসে চোখের পানি ফেলেন। সেই সঙ্গে পরিচিতজনদের সঙ্গে সেদিনের দুর্বিষহ স্মৃতি ও নিজের বেঁচে ফেরার গল্প শোনাতে থাকেন। তেমনই একজন এফ আর টাওয়ারের ১৩ তলায় অফিস থাকা ডার্ট গ্রæপের গাড়িচালক আলমগীর।

গত ২৬ আগস্ট সরেজমিনে দেখতে গেলে এফ আর টাওয়ারে সামনে এক হকারের কাঁধে হাত রেখে কান্না করতে দেখা যায় আলমগীরকে। কান্নার কারণ সম্পর্কে তিনি জানান, ঘটনার দিন তিনি ভবনের ভেতরে ১৩ তলাতে ছিলেন। আগুনের খবর পাওয়ার পর সবাই ছোটাছুটি করে ছাদে উঠতে থাকে। কিন্তু তার পায়ে রড ভরা থাকায় সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে পারবেন কিনা সংশয়ে পড়ে যান। এরই মধ্যে অনেককে তার বেয়ে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে মারা যাওয়ার খবর শুনতে পান। পুরো ভবনটি তখন আগুনের ধোঁয়ায় অন্ধকারচ্ছন্ন। মন আর সায় দিচ্ছিল না। আলমগীর বলেন, মাকে ফোন দিয়ে বললাম, ‘অফিসে আগুন লাগছে। বের হতে পারছি না। আর মনে হয় ফিরব না। মাফ করে দিও।’ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আলমগীর বলতে থাকেন, অন্যদের সহযোগিতায় ছাদে গিয়ে পাশের ভবনের ছাদে গেলে প্রাণে বেঁচে যাই।

এখন তো ভবনটি বন্ধ, তাহলে কেন এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে অনেকেই পরিচিত। সময় পেলে দেখা করতে চলে আসি। আলমগীরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হকার রিপন বলেন, ১০ বছর ধরে এখানে শার্ট-প্যান্ট বিক্রি করি। ঘটনার দিন আমিই প্রথম আগুন দেখতে পাই। আমার চিল্লাচিল্লিতে নিচতলার সবাই বাইরে বেড়িয়ে আসে। পরিচিত অনেককেই চোখের সামনে মরতে দেখেছি। এমন দিন যেন আর ফিরে না আসে।

ভবনটির সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলেও পেছনের অংশে এফ আর টাওয়ার ওনার সোসাইটি ও ল্যান্ড ওনার সোসাইটির অফিস দুটি খোলা পাওয়া যায়। ল্যান্ড ওনার সোসাইটির ম্যানেজার কামাল হোসেন বলেন, ভবনটি পুনরায় চালু করার জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। জানতে পেরেছি গণপূর্ত থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে। এরপর প্রয়োজনীয় সংস্কার করে হয়তো ভবনটি চালু করার বিষয়ে ভাবা হবে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ মার্চ বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের পাশের ১৭১ নম্বর সড়কে ফারুক রূপায়ন (এফআর) টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে ২৫ জন ও হাসপাতালে ১ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় আহত হন ৭৩ জন। এছাড়া একই ঘটনায় আহত হয়ে ফ্যায়ারম্যান সোহেল রানাও মারা যান। ওই ঘটনায় বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মিল্টন দত্ত ৩০ মার্চ বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলা দায়েরের পরই (৩০ মার্চ) বারিধারার নিজ বাসা থেকে তাসভির উল ইসলাম এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ভবনের জমির মালিক প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুককে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের ১১ দিনের মাথায় মামলাটিতে গত বছর ১১ এপ্রিল জামিন পান তাসভিরুল ইসলাম। আর এক মাস ৫ দিন কারাভোগের পর গত বছর ৬ মে মামলাটিতে জামিন পান ফারুক। রূপায়ন গ্রæপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান ওরফে মুকুল গত বছর ২৩ জুন আত্মসমর্পণ করে জামিন পান।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English