নিষ্পাপ চেহারার তিন বছরের শিশু মারিয়াম। একটি বড় ওড়না কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে ছোট ছোট পায়ে বাড়ির চারদিকে ছোটাছুটি করছে। শত চেষ্টা করেও ঘাড়ের ওপর কিছুতেই ওড়নাটি স্থির রাখতে পারছে না, ওঠায় আবার পড়ে যায়। বাড়ির লোকজন মুগ্ধদৃষ্টিতে ছোট্ট পুতুলটির এই অভিনয় উপভোগ করছিল। আমরা সবাই জানি, বড়দের দেখেই মারিয়ামের মতো শিশুরা শেখে, বিশেষত আমরা লক্ষ করব, আমাদের ঘরের মেয়েশিশুরা শৈশব থেকেই বড়দের ওড়না মাথায় জড়িয়ে খেলাধুলা করে বেড়ায়। যখন খেলাধুলার সময় হয়, তখন ঝট করে আলমারি খুলে মায়ের সুন্দর রঙের ওড়নাটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বান্ধবীদের সঙ্গে খেলতে। এদিকে যে আলমারির অন্যান্য কাপড় নিচে ফেলে রেখে গেছে, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। মায়ের ওড়নাটি নিজের মতো করে মাথায় জড়িয়ে ছোট্ট শিশুটি আনমনে খেলতে থাকে। এটা হয় কারণ, পর্দা মানবপ্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তা লজ্জা ও সৌন্দর্য বোধের প্রতীক। নারীরা মাথা ও মুখমণ্ডল ঢেকে রাখাকে তাদের ভূষণ মনে করে।
আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া জান্নাতে নিষিদ্ধ ফলের স্বাদ আস্বাদন করার ঘটনার পর নিজেদের লজ্জা আবরণের অনুভূতি টের পান এবং এই পরিস্থিতিতে লজ্জা ঢাকতে তাঁরা জান্নাতের পত্রবৃক্ষ ব্যবহার করেন। এই স্বভাবজাত লজ্জানুভূতিই আমাদের আদি পিতা-মাতাকে নিজেদের ইজ্জত ও আব্রু ঢেকে রাখার তাকিদ দেয় এবং প্রাকৃতিকভাবেই তাঁরা পর্দাপালন শুরু করেন। মহান আল্লাহ পোশাককে আপন নিদর্শন আখ্যা দিয়েছেন। পোশাকের উদ্দেশ্য যেমন মানুষের শরীর আবৃত করার মাধ্যমে সৌন্দর্য প্রকাশ, ঠিক তেমন এর দ্বারা শরীরকে শীতের প্রকোপ ও গরমের প্রচণ্ডতা থেকে রক্ষা করাও অন্যতম লক্ষ্য। সুতরাং এসব দিক বিবেচনা করে যে পোশাক তৈরি করা হয়, সে পোশাকই হবে আদর্শ পোশাক।
ওড়না ও চাদর মুসলিম নারীদের পোশাকের আবশ্যকীয় অংশ। চাদর ও ওড়না তাকে মুসলিম পরিচয় দান করে। কেননা তা ইসলামী শরিয়তের বিধান পর্দাপালনে সহায়ক। ইসলামী শরিয়তের বিধান মতে, ঘরের বাইরে গেলে নারীরা অবশ্যই দেহের নির্দিষ্ট অংশ আবৃত করে রাখবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিনদের স্ত্রীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়, এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ ( সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৯)
প্রতিটি শিশুই জন্মগতভাবে নিষ্পাপ ও কোমল হৃদয়ের হয়ে থাকে। তাদের তুলনা করা হয় সদ্য ফোটা ফুলকলির সঙ্গে। পরিণত জীবনের সঙ্গে তাদের এই কোমলতা ও নিষ্পাপ ভাব টিকিয়ে রাখতে শালীন পোশাক ও পর্দার গুরুত্ব অপরীসিম। ছোট্ট শিশুদের মনে লজ্জা, শালীনতা ও পর্দার অনুভূতি জাগ্রত করা এবং তাদের নারীত্বের তালিম দেওয়া প্রত্যেক মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একটি সতেজ ফুটন্ত ফুল যেমন অনল প্রবাহে ঝলসে যায়, একটি স্বচ্ছ কাচপাত্রে যেভাবে ধূলিকণার আস্তর পড়ে তা অস্পষ্ট হয়ে যায়, ঠিক তেমনিভাবে বেপর্দা ও নগ্নতা নারীর সৌন্দর্য নষ্ট করে। মেয়ে পরিণত বয়সে উপনীত হলে একজন সচেতন মা কী করবেন? তখন তাঁর করণীয় হবে, নিজেও আগের তুলনায় পর্দার প্রতি বেশি যত্নশীল হবেন, মেয়ে বড় হলে তাকে শুধু ওড়না ও স্কার্ফ কিনে দিয়েই তিনি বসে থাকবেন না, বরং এগুলো পরিধানের পদ্ধতিও তাকে শিক্ষা দেবেন। বাসাবাড়িতে খেলাধুলার সময়ও মেয়েকে শালীন ও পর্দা সহায়ক পোশাক পরিধানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা প্রত্যেক মায়ের কর্তব্য। কেননা পর্দা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির অংশ আর প্রকৃতি যদি তার আপন স্বভাবের ওপর বহাল থাকে, তাহলে তো ঠিক আছে, নইলে প্রকৃতিও পথ হারাতে পারে।