বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাসম্পদ অধিকার চুক্তির বেশিরভাগ শর্ত পালনে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) অব্যাহতির মেয়াদ আগামী বছরের ১ জুলাই শেষ হচ্ছে। বাংলাদেশসহ এলডিসিগুলোর প্রস্তাব ছিল, কভিডের কারণে অর্থনীতির ওপর প্রভাব এবং আগে থেকে থাকা নানা সংকটের কারণে এই অব্যাহতি আরও ১২ বছর বাড়ানো হোক। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) সম্প্রতি ট্রিপস কাউন্সিলের বৈঠকে এ বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যায়নি।
১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিওর সদস্যরা বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাসম্পদ অধিকার (ট্রিপস) রক্ষায় চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থায় পেটেন্ট, লাইসেন্স, ট্রেডমার্ক, ভৌগোলিক নির্দেশক, ডিজাইন, বিরোধ নিষ্পত্তি প্রভৃতির ক্ষেত্রে নানা বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। তবে এলডিসিগুলোর জন্য অনেক শর্ত পূরণ করতে গেলে উৎপাদন ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিবেচনায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত ট্রিপস চুক্তি পরিপালনের বেশিরভাগ বাধ্যবাধকতা থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর একই বিবেচনায় ২০১৩ সাল পর্যন্ত এবং সর্বশেষ ২০২১ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত এই অব্যাহতি রয়েছে। এর বাইরে ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে আলাদা ধারায় এই অব্যাহতি রয়েছে ২০৩২ সাল পর্যন্ত।
সম্প্রতি জেনেভায় ডব্লিউটিওর ট্রিপস কাউন্সিলের বৈঠকে এলডিসিগুলোর পক্ষে আফ্রিকার দেশ শাদ প্রজাতন্ত্রের প্রস্তাব তোলা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, এসব দেশ গুরুতর অর্থনৈতিক, আর্থিক এবং প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করছে এবং সীমিত সামর্থ্য দিয়ে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছে। কভিড-১৯-এর কারণে এলডিসিগুলোর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এ কারণে ট্রিপস চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহতি চাওয়া হয়। ডব্লিউটিওর ওয়েবসাইটে এ-সংক্রান্ত নথিপত্রের তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ অব্যাহতি বাড়ানোর প্রস্তাবে জানায়, তারা এটি যাচাই করছে এবং আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সময় বাড়ানোর প্রস্তাবে সমর্থন করে। বৈঠকে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এলডিসির প্রস্তাবকে সমর্থন করে। কয়েকটি উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের প্রতিনিধি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, মেধাসম্পদের ওপর অধিকার কভিড-১৯ সম্পর্কিত ওষুধ ও প্রযুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধার সৃষ্টি করবে না।
মতামত জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কভিডের কারণে এলডিসিগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিবেচনায় ট্রিপসের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতির মেয়াদ বাংলাদেশ এবং সব এলডিসির জন্য জরুরি। শুধু কভিডের টিকার সুযোগ পাবে বলে মেয়াদ না বাড়ানোর যুক্তি সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। এলডিসি থেকে বের হওয়ার পরও যাতে এসব দেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত অব্যাহতি থাকে, সেই আলোচনা জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা নিতে হবে।
প্রসঙ্গত, ট্রিপস চুক্তির পরিপালন থেকে বিরত থাকার কারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলো রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা ভোগ করে। অন্যদিকে ওষুধ-সংক্রান্ত অব্যাহতির কারণে বাংলাদেশ পেটেন্ট ওষুধ উৎপাদন করতে পারে। এর ফলে একদিকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প উপকৃত হচ্ছে এবং অন্যান্য এলডিসিতে কম দামে ওষুধ রপ্তানি করতে পারছে।